top of page
  • Hasan Mahmud

নিরপেক্ষ ইতিহাস অবাস্তব

Updated: Aug 31, 2021


Photo: NewsInAsia, Al Jazeera.


২০০৯ সালের কথা। একদিন আমার খুব কাছের এক বন্ধু ফোন করে বলল ওর জন্য যেকোন একটা চাকুরী দেখতে। এসএসসি পাশের পর আর পড়াশোনা করেনি। এটাসেটা করে বেশ ভালোই চলছিল। এর মাঝে বিয়ে করে সংসারী হয়েছে, মেয়েও হয়েছে একটা। ভালো ব্যবসা করছিলো। কিছুদিন আগে ব্র্যাক থেকে ৫০,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ধরা খেয়ে গেছে। কি কারণে ঐ ব্যবসাটায় মার খেয়েছে। এখন সব বেঁচে দিয়েও পুরো ঋণ শোধ হচ্ছে না। আর তাই সে হন্যে হয়ে একটা চাকুরী খুঁজছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম সে ব্যবসায়ে রিস্কের কথা ভেবেছিলো কি না। সে জবাব দিয়েছে যে, আমাদের আরেক বন্ধু ত ব্যবসা লাভজনক করতে পেড়েছে। তাকে দেখেই সেও ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল।- ঘটনাটা বললাম এইটা বোঝানোর জন্য যে, ঋণ গ্রহন করলেই সবাই ‘বাই ডিফল্ট’ লাভজনক ব্যবসা করতে পারেনা, সম্ভবও নয়। খুদ্রঋণ নিয়ে ব্যবসায়ে লাভ-ক্ষতি দুইই হয়। লাভের ঘটনাগুলো নিয়মিত পত্রপত্রিকা, সভা-সমিতি, আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে ডিসকোর্সে আসছে। ক্ষতির ঘটনাগুলোও আসছে, তবে সেগুলো খুব অনিয়মিত এবং স্বল্প পরিসরে। ফলশ্রুতিতে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যের দিকটাই শুধু আমাদের মনে থাকে, আর ব্যর্থতাগুলো চাপা পরে যায়।


প্রত্যেক বছর ঈদের আগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় যা অনেক সময় সহিংসরূপ ধারণ করে (ইদানিং এটা আরো নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে)। তাদের ঠেকাতে সরকারী পুলিশ বাহিনীকে বেশ তরিৎ গতিতে ‘পুলিশি ব্যবস্থা’ নিতে দেখা যায়। অনেক সময় কিছু শ্রমিক মৃত্যুও বরণ করে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের সহিংসতার প্রায় সবগুলো ঘটনাই গণমাধ্যমে আসে সরকারবিরোধী নাশকতামূলক চক্রান্ত হিসেবে- বিএনপি, আওয়ামীলীগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক- সব সরকারের সময়ই। কিন্তু আমরা জানতে পারিনা যে, শ্রমিকদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ‘অতি অন্যায্য মজুরীর বকেয়া’ টাকার জন্যই তারা পথে নামে, দায়িত্বশীল কারো কাছে কোন আশার বাণী না পেয়েই সহিংসতার পথ বেছে নেয়। কারণ, পত্রিকাগুলো গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে নাশকতা বা জঙ্গী-কানেকশনের খবর এবং বিশ্লেষণমূলক কলামের জন্য যতখানি কাভারেজ বরাদ্দ রাখে, তার সামান্যতমও রাখেনা খেটে-খাওয়া এইসব মানুষের নিজেদের আন্দোলনের পক্ষে কথা প্রকাশের জন্য। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ব্যস্ত থাকে এডিট করা ‘ভিডিও-ফুটেজ’ প্রচারে যেখানে দেখা যায় শ্রমিকরা ভাঙ্গচুরে ব্যস্ত, পথচারীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। কিন্তু এইসব শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত কি রকম পরিশ্রম করে, কতটাকা মজুরী পায়, কিভাবে থাকে, কি খায় সেসব বিষয় আড়ালেই থেকে যায়। এর ফলে জনসাধারণের মনে সহজেই এই ধারণাটা ঢুকে যায় যে, এইসব শ্রমিকদের আন্দোলনে নামার কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই, এরা সরকারবিরোধী (এবং শিল্পায়ন তথা জাতীয় উন্নয়নের বিরোধী) ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করছে। কাজেই পুলিশের মাধ্যমে শক্তহাতে তাদেরকে দমন করা ঠিকই আছে, এমনকি বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে, বুট দিয়ে মারিয়ে হত্যা করাও!


-উপরের প্রসংগ দুটো নিয়ে আসলাম নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা+জানার বিষয়টা একটু খতিয়ে দেখতে। ইদানিং ‘নিরপেক্ষ ইতিহাস’ কথাটা আমাদের গণমাধ্যমের কল্যাণে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে, তা’ সে একাত্তরেরই হোক, আর তার পরবর্তী সময়েরই হোক। আমি বিশ্বাস করি যে, ইতিহাসের ‘নিরপেক্ষ পাঠ’ অসম্ভব। আসলে ‘নিরপেক্ষ ইতিহাস’ই অবাস্তব।




আমেরিকার বিখ্যাত এক ইতিহাসের অধ্যাপক Howard Zinn তার পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার পেছনের গল্প বলা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, কলেজছাত্র অবস্থায় একদিন তিনি এক পল্লীগায়কের (Folk Singer) গান শুনছিলেন। গীটারের ধীরলয়ের করুণ সুরে সে পারফর্ম করছিলো একটি ব্যালlড The Ludlow Massacre। এর থিমটা ছিলো ১৯১৪ সালে দক্ষিন-কলোরাডোর কয়লাখনি অঞ্চলে রকফেলারকর্তৃক হরতালরত একদল নারী ও শিশুকে পুড়িয়ে মারার নির্মম কাহিনী। গানটি তাকে সেই ঘটনা সম্পর্কে দারুনভাবে কৌতুহলী করে তোলে। কিন্তু তার কোন ক্লাসে, কোন পাঠ্যবইয়ে তিনি সেই ঘটনার সম্পর্কে সামান্য বিবরণও খুঁজে পেলেন না। অনেক খোঁজখবরের পর তিনি American Labour Struggles একটা অখ্যাত বই পেলেন। এতে দশটি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনার বিবরণ আছে ইতিহাসের কোন ক্লাসের লেকচারে বা বইয়ে যেগুলোর উল্লেখ নেই।

কলোরাডোর সেই শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু হয় Colorado Fuel & Iron Corporation (রকফেলারের একটি প্রতিষ্ঠান) এর ভাড়াটে খুনির হাতে এক শ্রমিক নেতার নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে। খনিশ্রমিকরা এর প্রতিবাদে strike বা হরতালের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাস্তায় নামে। এই হরতাল ভন্ডুল করার জন্য রকফেলার Baldwine-Felts Ditective Agency নামে একটা strike-breaking সংস্থাকে ভাড়া করে যারা শ্রমিকদের তাঁবু লক্ষ্য করে বন্দুক, শটগান ও মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। কিন্তু তাতেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের মনোবল ভাঙ্গে না, তারা হরতালে অচল করে রাখে পুরো খনি এলাকা। স্টেট-গভর্ণর ন্যাশনাল গার্ডদের তলব করে। রকফেলার জুনিয়র নিউইয়র্কে এক সংবাদ বিবৃতিতে বলেন যে, তারা হরতালের বিরুদ্ধে উক্ত শহরের সকল ব্যাংকারের সমর্থন পেয়েছে্ন। স্টেট-গভর্ণর রাষ্ট্রীয় অর্থ ও লোকবল দিয়ে একটা মিলিশিয়া পাঠাচ্ছেন যারা হরতালকারীদের হটিয়ে দিয়ে মাইনারদের (!) খনি চালু রাখতে সাহায্য করবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, তারা চৌদ্দজন প্রভাবশালী পত্রিকা-সম্পাদকের সমর্থনও পাচ্ছেন হরতালের বিরুদ্ধে।

শহরে জাতীয় সেনাবাহিনীর পোষাকে আগত মিলিশিয়া বাহিনী দেখে হরতালকারীরা এই ভেবে আশ্বস্ত হলো যে, সরকারী সেনারা তাদেরকে ভাড়াটে খুনিদের থেকে রক্ষা করবে। আর তাই সেই বাহিনীকে তারা শান্তিপূর্ণ ভাবে শহরে প্রবেশ করতে দিল। কিন্তু হায়! তারা রকফেলারের পক্ষ নিয়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বেধরক পেটালো, গ্রেফতার করলো আর ভাড়াটে ষ্ট্রাইক-ব্রেকারদের খনিতে নিয়ে গেলো। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শ্রমিকরা সহিংস হয়ে উঠল। তারা একজন ষ্ট্রাইক-ব্রেকারকে ব্যাপক মারধোর করল, একজনকে গণপিটুনি দিয়ে মেরেই ফেলল।


রকফেলারের পক্ষ নেওয়া ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী আসন্ন শীতের অপেক্ষায় থাকল। এক শীতের রাতে তারা শ্রমিকদের তাঁবুগুলোতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করলো যেখানে এক হাজারের উপরে নারী, পুরুষ ও শিশু ছিলো। তারা রাতভর গুলি চালালো। ভোর রাতে গিয়ে সব তাঁবু আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিল। পুরো এলাকায় মানুষজনের কোন নিশানাই থাকল না। একদিন পর এক টেলিফোন লাইনম্যান লুডলো কলোনীর পাশ দিয়ে যাবার পথে ছাইভষ্মের মাঝ থেকে একটা লোহার আবরণ তুলতে গিয়ে একটা গর্তের মাঝে দুইজন নারী+এগারো জন শিশুর পোড়া গলিত মৃতদেহ আবিস্কার করে। তার থেকেই বাইরের পৃথিবী জানতে পারে উক্ত গণহত্যার কথা। এই থেকে এই মর্মান্তিক গণহত্যাই The Ludlow Massacre নামে পরিচিত হয়, যা নিয়ে কোন এক পল্লীকবি গান রচনা করেছেন।


এখন কথা হচ্ছে, আমেরিকার ইতিহাসের যাবতীয় সিলেবাস ও পাঠ্যবই কেন এই আন্দোলনকে এড়িয়ে গেল? এটা ত নিশ্চিত যে, হরতালের বিরুদ্ধপক্ষের ব্যাংকার, ন্যাশনাল গার্ড, বা পত্রিকার সম্পাদকরা রকফেলারের সাথে কোন গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে এই ঘটনাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেনি। তারা এমন কোন সিদ্ধান্তও নেয়নি যে, যেকোন উপায়েই হোক রকফেলারের ইমেজকে উজ্জ্বল করে দেখাতে হবে। হাওয়ার্ড জিনের মতে এই এড়িয়ে যাওয়াটা ঘটেছে (১) আমেরিকায় প্রবলবভাবে প্রচলিত একটা অনুচ্চারিত ধারণা থেকে যে, এই শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা শ্রমিকদের আরো প্রতিবাদী হতে উৎসাহ যোগাবে, জাতীয় পর্যায়ে শ্রমিক আন্দোলনকে বেগবান করবে। আর শ্রমিক আন্দোলন মানেই কমিউনিস্ট শাসনের দিকে যাত্রা যা’ পুঁজিবাদী আমেরিকার সম্পুর্ণ বিপরীত ধারার শাসন। পাশাপাশি এই বিশ্বাস থেকে যে, (২) আমেরিকা হলো ফ্রী-এন্টারপ্রেনারদের দেশ। আমেরিকার উন্নয়নের মূল চাবিকাঠিই হলো রকফেলারের মতো এন্টারপ্রেনাররা (কয়েকটি প্রচলিত ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ের ভূমিকায় সরাসরি এটি উল্লেখ আছে)। তাই ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে সকলের উচিত রকফেলারের (এবং সেই সাথে সকল ব্যক্তি-উদ্যোক্তার) পাশে দাঁড়ানো, তাদের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে সাহায্য করা।

– এই যে আমেরিকার ইতিহাসের পাঠ্যবই থেকে The Ludlow Massacre এর হারিয়ে যাওয়া এবং এর ফলশ্রুতিতে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আমেরিকার ইতিহাসে শ্রমিকদের অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞান, তা’ কোন নিরপেক্ষ ইতিহাস চর্চার নমুনা নয়, বরং একটা বিশেষ মূল্যবোধের দ্বারা প্রভাবিত ইতিহাসচর্চার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একই ধারায় লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, নানা জাতির ইতিহাসও কোন না কোন বিশেষ মূল্যবোধ দ্বারাপ্রভাবিত। প্রত্যক্ষে, পরোক্ষেও।


এ পর্যায়ে আশা করি আমি বোঝাতে পেরেছি কেন আমি নিরপেক্ষ ইতিহাসকে অবাস্তব বলে মনে করি। এখন প্রশ্ন দেখা দেয় যে, তাহলে কি আমরা ইতিহাসকে ত্যাগ করবো? অবশ্যই না। কিন্তু তাহলে বিশেষ একটা মূল্যবোধের দ্বারা প্রভাবিত ইতিহাসকে আমরা কিভাবে গ্রহন করবো বা গ্রহনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করবো? এক্ষেত্রে অনিবার্য ভাবে এসে পড়ে রচিত ও চর্চিত ইতিহাসের ভিত্তিতে যে মূল্যবোধ, তা’র বিচার। সেই মূল্যবোধ যদি গ্রহনযোগ্য হয়, তাহলে তা’র উপর দাঁড়ানো ইতিহাসও গ্রহনযোগ্য হবে। স্বাধীনতা, সাম্য, শান্তি, ন্যায়বিচার ইত্যাদি বিশ্বের সকল সমাজে গ্রহনযোগ্য মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত। আর তাই এসবের ভিত্তিতে রচিত ও চর্চিত ইতিহাসও তাই গ্রহনযোগ্য ইতিহাস।




হাওয়ার্ড জিনের মতে ইতিহাস চর্চায় ঐতিহাসিকের অসততা নয়, মূল সমস্যা হচ্ছে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ঘটনাকে বাদ দেওয়া বা কম প্রাধান্য দেওয়া। আর ঘটনার এই ‘গুরুত্ব’ অবশ্যম্ভাবীরূপেই নির্ণীত হয় মূল্যবোধের দ্বারা। এইখানে মূল্যবোধ নিয়ে দু’টো কথা না বললেই নয়ঃ মূল্যবোধ বলতে আমরা কি বুঝি?- সমাজবিজ্ঞানে মূল্যবোধ বলতে সমাজে প্রচলিত যেকোন বিষয় সম্পর্কে ‘সঠিক-প্রত্যাশিত-ভালো এবং ভুল-অপ্রত্যাশিত-খারাপ ধারণাসমষ্টি’কে বোঝানো হয়, যেমন আমাদের সমাজে বয়োজেষ্ঠ্যদের সম্মান করা আর ছোটদের স্নেহ করা, গরীব-অসহায়কে সাহায্য করা, বাবা-মা’র বাধ্য থাকা, কঠোর পরিশ্রম করা, ইত্যাদি সঠিক-প্রত্যাশিত-ভালো হিসেবে বিবেচিত। আবার এসবের উল্টোটি ভুল-অপ্রত্যাশিত-খারাপ।


হাওয়ার্ড জিনের ধারায় বিশ্লেষন করলে সহজেই বোঝা যায় কেন আমাদের দেশে ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যগাঁথাই শুধু পাঠ্যে অন্তর্ভূক্ত হয় আর ব্যর্থতাগুলো হারিয়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিক থেকে আমাদের মূল্যবোধ্যের মধ্যে একটা মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। আগে ঋণকে খুবই খারাপ একটা বিষয় হিসেবে দেখা হতো। একারণে পাঠ্যক্রমের মধ্যেও এমন সব আলোচনা, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত ছিল যেখানে ঋণের খারাপ ফলাফলগুলোকে হাইলাইট করার মাধ্যমে জনগণকে ঋণগ্রহনে নিরুৎসাহিত করা হতো। গণি মিয়া নামের এক ধনী কৃষকের কাহিনী নিয়ে একটা গল্প ছিল যেখানে দেখা যায় যে, গণি মিয়া ঋণের টাকায় ব্যাপক ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দেয়। কিন্তু সময়মতো ঋণ শোধ করতে না পেরে সে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় আইনেও ব্যক্তি-পর্যায়ে ঋণ লেনদেন নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই মূল্যবোধ বদলে গেছে। এখন ঋণকে বিবেচনা করা হচ্ছে উন্নয়নের উপায় হিসেবে। এমনকি মাইক্রো-ক্রেডিট নামের চরম-দারিদ্র্য উৎপাদনযন্ত্রের আবিষ্কারক’ ডঃ ইউনূস ঋণকে সার্বজনীন মানবাধিকারের মতো মৌলিক অধিকার (!) হিসেবে প্রচার করে চলেছেন। কারণ, তার এবং তার অনুসারীদের দাবী অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য বিমোচন করে। যেহেতু বড় বড় ডিগ্রীওয়ালা পন্ডিতরা ক্ষুদ্রঋণকে দারিদ্র্যনাশিনী বলছে, তাই এটা আমাদের সমাজ সঠিক বলে গৃহীত। যেহেতু এটি দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয় তাই এটা ভালো এবং একই কারণে প্রত্যাশিতও বটে। ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে আমাদের এই যে মূল্যবোধগত অবস্থান, এর কারণেই পাঠ্যবইয়ে শুধুই এর জয়গান, জনৈক সুফিয়া বা জাহানারাদের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ধনী হওয়ার কাহিনী; আর পুর্বের মুল্যবোধ থেকে উৎসারিত ভুল+খারাপ+অপ্রত্যাশিত ধারণার পক্ষে যায় ক্ষুদ্রঋণের এমন সব ফলাফল অনুপস্থিত। একারণেই গণি মিয়ার মতো হাজারো মানুষের ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হওয়ার কাহিনী পাঠ্য থেকে (এবং ইতিহাস থেকেও) ক্রমশঃ হারিয়ে গেছে ও যাচ্ছে।


একই ভাবে, গার্মেন্টস শিল্পকেও আমাদের জাতীয় উন্নয়ণের তথা দারিদ্র্যমুক্তির জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে আমাদের মূল্যবোধ গার্মেন্টস শিল্পকে যেকোন ভাবে টিকিয়ে রাখার পক্ষে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী আদায়ের আন্দোলনও তাই আমাদের সাধারণের বিবেচনায় জাতীয় স্বার্থবিরোধী, কাজে কাজেই ভুল-অপ্রত্যাশিত-খারাপ। একারণেই পাঠ্যবইয়ে গার্মেন্টস শিল্পে কয়েক লক্ষ দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের বিবরণ অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে একে মহিমান্বিত করা হলেও এই শিল্প প্রকৃত অর্থে সেইসব মানুষকে দারিদ্র্য থেকে কতটা মুক্তি দিয়েছে, তাদের জীবনে কতটা স্বাচ্ছন্দ দিয়েছে সেই বিষয়ে পুরোপুরি নির্বিকার!


অতএব, আমাদের দেশে ক্ষুদ্রঋণ আর গার্মেন্টস শিল্পের যে ইতিহাস রচিত ও চর্চিত হচ্ছে এবং হবে, তা’ অনিবার্য ভাবেই বিশেষ একটা মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত। এই মূল্যবোধটা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশ হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতীয় লক্ষ্য, আর এই লক্ষ্য অর্জনের পথে ক্ষুদ্রঋণ আর গার্মেন্টস শিল্প হচ্ছে কার্যকরী পাথেয়।




আমি উপরে বর্ণনা করেছি যে, কোন ইতিহাস গ্রহনযোগ্য হবে কি না তা’ নির্ভর করে তা’র পেছনে অবস্থানকারী মূল্যবোধের গ্রহনযোগ্যতার উপর। তাহলে এবার দেখা যাক ক্ষুদ্রঋণ আর গার্মেন্টস শিল্প দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে আমাদের মাঝে ‘সঠিক-প্রত্যাশিত-ভালো’ বলে মূল্যায়িত তা’ কতোটা গ্রহনযোগ্য।

ক্ষুদ্রঋণের দারিদ্র্যনাশক ক্ষমতা কতোটা বাস্তব আর কতোটা বানোয়াট প্রপাগান্ডা তা’ এখন অনেকটাই প্রকাশিত। সাপ্তাহিক ২০০০ এর মে ২২, ২০০৯ সংখ্যায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ধনী হওয়া সুফিয়া বেগমের বহুল প্রচারিত পাকাবাড়িটির প্রকৃত মালিক এক মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশী। উক্ত সুফিয়া বেগম ১৯৯৮ সালে অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করেছে। একই সংখ্যায় আরো দুটি রচনা আছে ক্ষুদ্রঋণের মিথ্যাচার নিয়ে। দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণের কথিত সাফল্যের কাহিনী আসলে যে ভুয়া তা গ্রামীন ক্ষুদ্রঋণের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতও (ইনিই স্বৈরাচারী এরশাদের সময় অর্থমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৮৪ সালে অসাংবিধানিকভাবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে গ্রামীন ব্যাংককে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের সরকারী অনুমোদন দেন) স্বীকার করে ক’দিন আগে এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, “ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য দূর করে না, বড়জোর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে”!


তারমানে, ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য বিমোচন করে -এই ধারণা সঠিক নয়, অতএব ক্ষুদ্রঋণ প্রত্যাশিত নয়, ভালো ত’ নয়ই। কাজে কাজেই ক্ষুদ্রঋণের বিষয়ে আমাদের যে মূল্যায়ন এবং তা’র উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বর্তমান পাঠ্য ইতিহাস গ্রহনযোগ্য নয়।


গার্মেন্টস শিল্পে যেসকল মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, তাদের অবস্থা পর্যালোনা করলে এই শিল্পের মাধ্যমে দারিদ্র্য মুক্তির বিষয়টা পরিষ্কার হয়। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকার সাথে গার্মে্নটসের একটা মৌলিক পার্থক্য আছেঃ ক্ষুদ্রঋণ যেখানে কৃতিত্ব দাবী করে দারিদ্র্য দূর করার, গার্মেন্টস শিল্পের কৃতিত্ব সেখানে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকার। অর্থ্যাৎ, গার্মেন্টস শিল্প নিঃস্ব মানুষদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেঁচে থাকার উপায় করে দেয়। কিন্তু সেই বেঁচে থাকাটা কেমন? প্রতিদিন ১৫/১৬ ঘন্টা অবিরাম হারভাঙ্গা খাটুনির পর মাস শেষে ৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, যা’ এই সময়ে এমনকি বস্তিতে থাকার জন্যও অপর্যাপ্ত।এর পরেও যখন গার্মেন্টস মালিকদের কেউ কেউ সেই সামান্য মজুরি প্রদানে টালবাহানা করে, বকেয়া রেখে অকষ্মাৎ কারখানা বন্ধ করে দেয় বিনা নোটিশে তখন শ্রমিকদের সেই পাওনা আদায়ের জন্য না আছে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, আর না আছে ইচ্ছা। এমতাবস্থায় নিরূপায় হয়ে প্রতারিত শ্রমিকরা রাস্তায় নামা ছাড়া আর কি করতে পারে। কিন্তু তখন সেই শ্রমিকদের শায়েস্তা করার জন্য কিন্তু রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও ইচ্ছে কোনটারই কমতি নেই। আর তাই পাওনা বকেয়া রেখে গার্মেন্টস মালিকরা দুবাই কি ব্যাংকক ভ্রমনে গেলেও রাষ্ট্রের কোন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু শ্রমিকরা রাস্তায় নামামাত্র পুলিশ-র‍্যাবসহ যাবতীয় শক্তি নিয়ে রাষ্ট্র ঝাপিয়ে পড়ে উন্নয়নের তথা দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কথিত হাতিয়ার গার্মেন্টস শিল্প রক্ষার নামে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হুশিয়ার করেন আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার।


যে ধারণার ভিত্তিতে গার্মেন্টস শিল্পে মালিকদের পক্ষে আমাদের মূল্যবোধগত অবস্থান যে, গার্মেন্টস শিল্প নিঃস্ব মানুষদের খেয়েপড়ে বাঁচার মত কর্মসংস্থান দিচ্ছে, সেই খাওয়া-পড়ার উপায় তথা মজুরী পাওয়ার নিশ্চয়তাই যদি না থাকে তাহলে সেই মূল্যবোধের গ্রহনযোগ্যতা অনিবার্যভাবেই নিঃশেষ হয়। তারমানে, যে মূল্যবোধের কারণে আমাদের শিল্পমালিকদের প্রতি সহানুভূতি আর শ্রমিকদের প্রতি ঔদাসিন্য, তা ভুল, অপ্রত্যাশিত ও খারাপ। অতএব, এই বিষয়ে বর্তমান পাঠ্যসমূহের বয়ান গ্রহনযোগ্য নয়।




উপরের আলোচনায় আমি দেখাতে চেষ্টা করেছি কেন নিরপেক্ষ ইতিহাস চর্চা সম্ভব নয় এবং আমাদের বর্তমান পাঠ্যে অন্তর্ভূক্ত ক্ষুদ্রঋণ ও গার্মেন্টস শিল্প বিষয়ক ইতিহাস গ্রহনযোগ্য নয়। তাহলে কি ইতিহাসের চর্চা ছেড়ে দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের জানা দরকার ইতিহাস চর্চার প্রয়োজনীয়তাটা কি।


ইতিহাস চর্চার প্রয়োজন গ্রহনযোগ্য মূল্যবোধের আলোকে সমাজবদলের স্বার্থেই। মানুষের সমাজ মানুষই গড়ে, মানুষই ভাঙ্গে। এই ভাঙ্গাগড়ার খেলায় মূল নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করে সমাজে সর্বজনগ্রায্য মূল্যবোধ- শ্রমের মর্যাদা, স্বাধীনতা, ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, ইত্যাদি। পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা-ঐক্য-ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে যে সমাজ, সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের উপর গড়া সমাজের তুলনায় তা’ বাস্তবিক কারণেই অধিক কাম্য। আর তাই সেইসব মূল্যবোধের ভিত্তিতে যে ইতিহাস, তথা বর্তমানে অনুল্লেখিত-অবহেলিত ইতিহাসকে যথাযথ ‘গুরুত্ব’ দিয়ে আমাদের পাঠ্যে নিয়ে আসতে হবে।


মোটকথা, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষদের কথাগুলোকে, আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকদের কথাগুলোকে যথাযথ ‘গুরুত্ব’ দিয়ে পাঠ্যক্রমে নিয়ে আসতে হবে যা’তে সার্বজনীন মূল্যবোধের ভিত্তিতে সকলের জন্য (অন্ততঃ সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের জন্য) উৎকৃষ্ট একটা সমাজ গড়া যায়।


নোটঃ এই ব্লগ প্রথমে ২০০৯ সালে ক্যাডেট কলেজ ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল


284 views0 comments

Recent Posts

See All

‘বাঙালি মুসলমানের মন’: গোঁজামিলের এক জ্ঞানবৃক্ষ

১ জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন মাত্রা আছে, আছে তার বিবিধ বহিঃপ্রকাশ। মোটাদাগে, জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে জড়িয়ে থাকা উপাদানগুলোকে আলাদা করা হয় জাতিসত্তা (ethnic membership) এবং নাগরিকতার পরিচয়ের (political membersh

Comentarios


bottom of page