top of page
  • Hasan Mahmud

উন্নয়নঃ আমাদের কল্পনা ও বাস্তবতায়

Updated: Jun 26, 2023


কৃতজ্ঞতাঃ ছবিটি দৈনিক ইত্তেফাক থেকে সংগৃহীত।



আমরা প্রতিদিন উন্নয়নের কথা শুনি। লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের উন্নয়নের কথা শুনি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায়, আবার কয়েক হাজার টাকা মূল্যের উন্নয়নের কথাও শুনি ব্র্যাক, গ্রামীণ, আশা, ইত্যাদি এনজিওর কাছ থেকে। বড় বড় দালান-কোঠা, পাতাল রেল, আকাশচুম্বী অট্টালিকা তৈরি যেমন উন্নয়ন, একইভাবে গ্রামেগঞ্জে দরিদ্র এলাকায় রাস্তাঘাট মেরামত, পাকা টয়লেট বসানো, এমনকি পাঁচ-দশ হাজার টাকার ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করাও উন্নয়ন। সোজা কথায়, বড়লোকি কায়কারবারও উন্নয়ন, আবার গরিবী হটানোর জন্য গরীবদের মাঝে গরিব-বান্ধব কর্মসূচিও উন্নয়ন। এহেন যে জগাখিচুড়ীমার্কা বোঝাবুঝির জন্যই উন্নয়নের নামে সবকিছুই চালিয়ে দেওয়া যায়। এজন্যই আমি বলি, উন্নয়ন হলো ঘোড়ার ডিম।


আদতে উন্নয়ন বলতে আসলেই কিছু একটা আছে। সেজন্যই আমরা সকলেই উন্নয়ন কামনা করি। এইটা হলো একটা আশ্বাস, অতীত ও বর্তমান অবস্থান থেকে ভবিষ্যতে ভালো কিছু প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা। বর্তমানে ক্ষুধার্ত থাকলে আগামীতে সেই ক্ষুধা নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের আশ্বাস, বর্তমানে রাস্তাঘাট ভাঙ্গাচুরা থাকলে আগামীতে সেগুলো সচল করার আশ্বাস, বর্তমানে নানারূপ রোগব্যাধি থাকলে আগামীতে সেগুলোর নিরাময়ের আশ্বাস, বর্তমানে সামাজিক অনাচার থাকলে আগামীতে সেগুলো দূর করার আশ্বাস। ফলশ্রুতিতে, উন্নয়নের নামে যেকোন কর্মসূচি প্রস্তাবিত হলে আমরা সাধারণভাবে সেগুলোকে স্বাগতঃ জানাই। আর সেইসব কর্মসূচির পেছনে যেসব ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান থাকে, তাদেরকে সমর্থন করি, সম্মান দেই। এজন্যই ফজলে হাসান আবেদ, ডঃ ইউনূস বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। তারা মেধা দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, সমগ্র জীবনের প্রচেষ্টা দিয়ে উন্নয়নের একেকটা মডেল দিয়েছেন, বাংলাদেশসহ আরও অনেক উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র মানুষকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে এসেছেন।


কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় সেই সব উন্নয়নের মডেলগুলো যে আশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এগিয়ে আসে, তার বাস্তবায়ন নিয়ে। দারিদ্র্য দূরীকরণের আশ্বাস দিয়ে শুরু করে তারা কতটা দারিদ্র্য দূর করে? ক্ষুধা নিবারণের আশ্বাস দিয়ে এসে তারা কতটা খাদ্যের সংস্থান করে? রোগবালাই থেকে মুক্তির আশ্বাস দিয়ে তারা কতটা নিরাপদ স্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দেয়?




সাধারনঃত আমরা ধরে নিই যে, উন্নয়নের আশ্বাসগুলোর ভিত্তিতেই সেইসব প্রকল্প এবং সেগুলো বাস্তবায়নে নিয়োজিতদেরকে মহৎ হিসেবে বিবেচনা করা এবং সম্মানিত করা যথার্থ। কারণ, এই যুগে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অলাভজনক উন্নয়ন প্রকল্পে নিজের শ্রম, সময় ও সম্পদ নিয়োজিত করার মত মানসিকতার লোকজন খুব বেশি নেই।


তবে বাস্তবে এইসব উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে তাকালে উন্নয়নের আশ্বাস আর কঠিন বাস্তবতার মাঝে ফারাকটা প্রায়শঃই বেশি দেখা যায়। যেমন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামের লক্ষ লক্ষ নারীকে সামান্য কয়েক হাজার টাকার ঋণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা বানিয়ে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির আশ্বাস বাস্তবে সিংহভাগ ঋণগ্রহীতার জন্যই কাঁধে চেপে বসেছে নতুন ধরণের ঋণের ঘানি। ফলে আংশিক দরিদ্ররা পতিত হয়েছে চরম দারিদ্র্যে, আর অতিদরিদ্ররা হয়েছে ভিটেমাটি ছাড়া। আশির দশকের মধ্যভাগে যে অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষরে গ্রামীণ ব্যাংক সরকারী অধ্যাদেশ অনুযায়ী অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল টাঙ্গাইল জেলার একটা উপজেলা থেকে, তিনযুগ পরে সেই একই অর্থমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করে নেন যে, গ্রামীণ ব্যাংক দারিদ্র্য দূর করেনা। আর একাডেমিক পরিমণ্ডলে যত গবেষণা হয়েছে, তার কোনটাই ক্ষুদ্রঋণের দারিদ্র্য বিনাশী শক্তি খুঁজে পায়নি।


শূন্যথেকে শুরু করে আমাদের দেশের একেকটা এনজিও গত তিন দশকে শত-হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছে। নিজ নিজ কর্মসূচিকে জাতীয় পর্যায়ে, এমনকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রহীতাদের দারিদ্র্য দূর না-হলেও ঋণ বিতরনকারী এনজিওগুলো একেকটা বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মত নানান ধরণের ব্যবসা খুলেছে, আকাশচুম্বী অট্টালিকা গড়েছে, ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে, এমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মালিক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু যেই হারে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণকারী এনজিওরা শত-হাজার কোটিপতি বনেছে, সেভাবে দারিদ্র্য দূরকরণ ঘটেনি কোথাওই।


বর্তমানে মাথা পিছু জিডিপি বৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে দাবী করা হচ্ছে যে, দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। অথচ, একই সাথে সরকারী পরিসংখ্যান ব্যুরোর আরেক গবেষণা হিসেবে করে দেখিয়েছে যে, মানুষের প্রকৃত গড় মাথাপিছু আয় এবং খাবার গ্রহণের পরিমাণ দুইই কমেছে। আর নির্দিষ্ট খাতের লোকজনের অবস্থা বিবেচনা করলে ত উন্নয়নের বাস্তবতার আরও ভয়াবহ করুণ রূপ দেখা যায়। যেমন, পোশাকশিল্পে ১৫০০ কারোখানার শ্রমিকদের উপর জরিপ চালিয়ে অক্সফাম পেয়েছে যে, প্রত্যেক শ্রমিকের আয় তাদের জীবনধারণের ন্যুনতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত। অর্থের অভাবে প্রায়ই আধপেটা খেয়ে, স্বল্পমূল্যের অপথ্য-কুপথ্য খেয়ে দিন গুজরান করতে হয় বিধায় গার্মেনটস কর্মী নারীদের শতকরা আশিভাগই অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভোগে বলে আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে। অথচ, এই গার্মেনটস শিল্প দেশের উন্নয়ন তথা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করে এই দাবীর ভিত্তিতে সরকার গার্মেনটস মালিকদের জন্য রপ্তানিতে ভর্তুকি বাবদ বিগত সালের বাজেটে বরাদ্দ দিয়েছে ২৮২৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে সমস্ত গার্মেনটস কর্মীদের জন্য বছর ব্যাপী পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব।




উন্নয়নের আশ্বাস বা স্বপ্ন বাস্তবায়নের দাবীগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয় কিছু তথ্য দিয়ে যার মধ্যে সবথেকে বেশি প্রচলিত হচ্ছে মাথাপিছু জিডিপি। কিন্তু এই পরিসংখ্যানটি কখনোই উন্নয়নের যর্থার্থ পরিমাপক নয়।


কোন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার গাণিতিক সূচক হিসেবে জিডিপি’র ধারণাটা প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকার অর্থনীতিবিদ সায়মন কুজনেটস। ১৯৩৭ সালে কুজনেটস দেখান যে, জিডিপি কিভাবে একটা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নতি ও অবনতি নির্দেশ করে। কিন্তু আরেকটা গুরুত্বপূর্ন দাবীও তিনি করেন যে, জিডিপি শুধুমাত্র আর্থিক অবস্থার সূচক, উন্নয়নের নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাগে এসে বিশ্বব্যাংক এবং আইএকএফ একযোগে জিডিপিকেই দেশসমূহের উন্নয়নের সূচক হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। কালক্রমে সকলেই জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপের ভ্রান্ত ধারণাকে সঠিক বলে গ্রহণ করে নেয়। তবে একাডেমিক ও গবেষকদের কেউ কেউ শুরু থেকেই এই ভ্রান্ত উন্নয়ন সূচকের সীমাবদ্ধতা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। যেমন, মোজেস আব্রামোভিচ ১৯৫৯ সালেই জিডিপি’র মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিমাপের সমালোচনা করেছেন। আর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক জোসেফ Stiglitz জিডিপি’কে পুরোপুরি বাতিল করার জন্য আহ্বান করেছেন।


উন্নয়ন কর্মকান্ডের সেক্টরভিত্তিক পর্যালোচনাতেও দেখা যায় নানান ধরণের পরিসংখ্যানের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সাফল্যের দাবী প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। উদাহরণ হিসেবে ক্ষুদ্রঋণকে বিবেচনা করি। দাবী করা হয় যে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গ্রহীতাদের প্রায় সকলে সফল ক্ষুদ্রব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং নিজ নিজ পরিবারকে দারিদ্রমুক্ত করে। এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে হাজির করে ঋণ পরিশোধের হার, যা শতকরা পঁচানব্বইয়েরও বেশি। বলা হয়, ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হয় শুধুমাত্র দরিদ্রদেরকে যাদের কিছুই নেই এবং ঋণদাতা এনজিও কোন গ্রহীতার কাছ থেকে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে ঋণের কিস্তি আদায় করে না। বরং গ্রহীতারা স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে। যেহেতু শুরুতে তাদের কিছুই ছিলনা এবং যেহেতু তারা স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করছে, কাজেই তারা অবশ্যই গৃহীত ঋণের মাধ্যমে সফলভাবে আয় উপার্জন করতে পেরেছে। ক্ষুদ্রঋণের মহাজনের এই দাবীর মধ্যে খানিকটা সত্যের সাথে খানিকটা চালাকির ভেজাল আছে। যেমন, এনজিওরা সত্যি সত্যি ঋণ গ্রহীতাদের কোন সম্পদ আছে কিনা তা’ বিবেচনা করেনা। একইভাবে এনজিওরা ঋণ গ্রহিতাদেরকে জোরজবরদস্তিও করেনা কিস্তি আদায়ের সময়। কিন্তু তারা সকল ঋণ প্রার্থিকে একটা সিস্টেমের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় যা’ উক্ত কাজগুলো তথা প্রার্থিদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে বাছাই করা এবং সময়মত কিস্তি পরিশোধে বাধ্যকরার কাজগুলো করে।


লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের অধ্যাপক সোহিনী কর কলিকাতায় ক্ষুদ্রঋণের উপর তার এথনোগ্রাফিক গবেষণার ভিত্তিতে লেখা বই Financializing Poverty-তে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন সদস্যগ্রুপ তৈরি করার মাধ্যমে এনজিওগুলো কিভাবে ঋণপ্রার্থিদেরকে বাছাই করা এবং ঋণ বিতরণের পর প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে ফি সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময়ে কিস্তি আদায়ের দায়িত্ব দলগতভাবে সদস্যগ্রুরুপের সকলের উপর চাপিয়ে দেয়। এর মাধ্যমে -


একদিকে যেমন ঋণ প্রদানকারী এনজিও নিজেকে মহান হিসেবে জাহির করার সুযোগ পায় এই বলে যে, প্রচলিত ব্যাংকের মত দরিদ্রদেরকে তারা ঋণের সযোগ থেকে বঞ্চিত করছে না, আবার একইসাথে ব্যাংকের মতো ঋণ আদায়ের জন্য তারা ঋণ গ্রহীতাদের উপর জবরদস্তিও করছে না। অতএব, ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে যারা আছে, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে যারা নিয়োজিত তারা অবশ্যম্ভাবীরূপেই গরিবের বন্ধু, দারিদ্র্য বিনাশের পথিকৃৎ, উন্নয়নের মহানায়ক।


অন্যদিকে, সদস-দলের দ্বারা ঋণ প্রার্থিদের মধ্য থেকে বাছাইয়ের প্রক্রিয়া এবং সময়মত কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে এনজিওগুলো তাদের ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসা থেকে উচ্চহারে মুনাফা আদায় করে নেয় কড়ায় গন্ডায়।


গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, ইত্যাদি এনজিওর আর্থিক সাফল্যের চাবিকাঠি এই সেলেক্টিভিটি এবং জোরজবরদস্তিকে গোপন করার মাধ্যমে আর ঋণ পরিশোধের হারকে গ্রহীতার সাফল্য হিসেবে প্রচার করে নিজেদের গরীবের বন্ধু ইমেজ দাঁড় করায়।


উন্নয়নের আশ্বাস জনমতকে স্বপক্ষে নিয়ে আসায় এতোটাই কার্যকরি যে, ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সেগুলোর মালিকরাও তাদের লাভজনক ব্যবসার মাধ্যমে উন্নয়নে সহযোগী হওয়ার দাবী করে এবং এর বিনিময়ে নানান আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে।


যেমন, বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষের চাকুরী এবং সেইসাথে দেশের মোট রপ্তানী আয়ের শতকরা ৮৪ ভাগ আসে গার্মেন্টস শিল্প থেকে। কাজেই, সরকার গার্মেনটস শিল্পকে উন্নয়নের এক অপরিহার্য সহযোগই হিসেবে বিবেচনা করে এবং মালিকদের জন্য নানান রকম আর্থিক সুবিধা প্রদান করে। উপরে উল্লেখ করেছি প্চলতি বাজেটে রায় তিন হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির কথা। সেই সাথে সরকার গার্মেনটস রপ্তানী পণ্যের উপর ধার্য ট্যাক্স শতকরা ১ ভাগ থেকে কমিয়ে ২৫ পয়সায় নিয়ে এসেছে। এছাড়াও গার্মেন্টস শিল্প মালিকরা ২০০৫ সাল থেকে শুরু করে শতভাগ ভ্যাট মওকুফের সুবিধা পেয়ে আসছে। যেহেতু বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা বেশি এবং নাগরিকদের চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি করা সরকারের দায়িত্ব, তাই শিল্পায়নের মধ্যমে চাকুরীর সুযোগ বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করতে সরকার নানান রকম আর্থিক সুযোগ ও সুবিধা দিয়ে থাকে ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদেরকে। এক্ষেত্রে সরকার দেশীয় উদ্যোক্তাদের যতটা সুবিধা দেয়, বিদেশীদেরকে দেয় তার থেকেও অনেক বেশি। এর পেছনে রয়েছে এই বিশ্বাস যে, শিল্পায়নের মাধ্যমে কাজের সুযোগ তথা আয় উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা’ আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করে, তথা উন্নয়ন ঘটায়। শিল্প-উদ্যোক্তাদেরকে নানান সরকারী সুবিধা দিয়ে শিল্পকারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করার প্রক্রিয়ায় আরও আছে একটা কাঠামোগত ব্যাপার।



বৈদেশিক বিনিয়োগের দ্বারা শিল্পায়নের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের ধারণার সূত্রপাত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, বিশেষ করে পুঁজিবাদী আমেরিকা আর সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে বিশ্ব নের্তৃত্বের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিতে। সমাজতন্ত্রকে ঠেকানোর জন্য আমেরিকা প্রথমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজ নিজ জাতীয় আর্থিনীতি পূনর্গঠনের জন্য শর্তহীন আর্থিক সহায়তা দেয়। মাত্র একদশকের মধ্যেই অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশ সফলভাবে তাদের অর্থনীতিকে পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যে সুগঠিত করে নেয়। একই সময় এশিয়া ও আফ্রিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো ভেঙ্গে পড়ে এবং একের পর এক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। জাতীয়বাদের ভিত্তিতে স্বাধীনতা লাভ করা এইসব নতুন রাষ্ট্রের অধিকাংশই সমাজতান্ত্রিক বলয়ের দিকে ঝুঁকতে দেখে আমেরিকা এইসব দেশকেও পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১৯৪৯ সালে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে আমেরিকার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং সম্পদের প্রাচুর্যের সুফল সারা বিশ্বের কল্যাণে বিনিয়োগ করার যে নীতিমালা ঘোষণা করেন, সেটাই আজকের বিশ্বে উন্নয়নের ভিত্তি দান করে।


বাস্তবে আমেরিকার এই সহায়তা ইউরোপীয় দেশসমূহের জন্য ছিল সত্যিকার অর্থেই দান যেখানে এই অর্থ ফেরত দেওয়ার শর্ত ছিলনা এবং আমেরিকা কোন ইউরোপীয় দেশের কাছ থেকেই এই অর্থ ফেরত চায়নি। অথচ, আমেরিকা যত অর্থ এশিয়া, আফ্রিকা আর ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে উন্নয়ন সহায়তার জন্য দিয়েছে, তার পুরোটাই সুদে-মূলে ফেরত দেওয়ার জন্য প্রত্যেক দেশকে নানা ভাবে বাধ্য করেছে।


উন্নয়ন সহায়তার অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাপনার জন্য আমেরিকা তার ইউরোপীয় সহযোগীদের সাথে নিয়ে গঠন করেছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার এই তিন বিশ্বমোড়লে একত্রে সমস্ত উন্নয়নশীল দেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ঋণ দিয়েছে, বিনিময়ে এইসব দেশকে নানান নীতিমালার টোপে ফেলে এমন একটা বিশ্বায়নের কাঠামোর অন্তর্ভূক্ত করেছে যেখানে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য এই দেশগুলো ক্রমাগত চাপের মুখে থাকে।


রপ্তানীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা (নির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকান ডলার) অর্জন করেই কেবল এইসব দেশে ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারে। কিন্তু যেসব রপ্তানী পণ্যে এইসব দেশ অপেক্ষাকৃত বেশি পারদর্শী যথা কৃষিপণ্য, সেগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর ধার্যকৃত ট্যাক্স অপরিবর্তীত থাকলেও উন্নত দেশের মালিকানায় তৃতীয় বিশ্বে যেসব শিল্পপণ্য উৎপাদিত হয়, সেগুলোর উপর থেকে শতকরা ৭০ ভাগ ট্যাক্স বিলোপ করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো একদিকে যেমন নিজেদের কৃষিপণ্য রপ্তানী করে কম মুনাফা অর্জন করে, অপরদিকে শিল্পকারখানার পণ্যের উপর প্রাপ্য ট্যাক্স থেকে শতকরা ৭০ ভাগ আয় অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে, এইসব দেশ মরিয়া হয়ে প্রাকৃতিক সম্পদ পানির দামে উন্নত দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। জোসেফ ষ্টিগলিটজ তার বিখ্যাৎ গ্রন্থ Globalization and Its Discontents- এ বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেছেন কিভাবে আইএমএফ এর আরোপিত structural adjustment policy তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে ঋণদান ও আদায়ের মধ্য দিয়ে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।




উন্নয়নের সমাজবিজ্ঞান নামে একটা ক্লাস পড়াচ্ছি। ফল সেমিস্টারের মিড-টার্মের খাতা দেখলাম কয়েকদিন আগে। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা লিখেছে যে, উন্নয়ন কখনোই তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোন মহৎ প্রকল্প নয়। বরং, এর মাধ্যমে দেশ হিসেবে আমেরিকা বিশ্বের নের্তৃত্বে আসন পাকাপোক্ত করেছে আর আমেরিকান এবং অন্যান্য উন্নত দেশের কর্পোরেট/পুঁজিপতিদের জন্য সস্তা শ্রমিক, সহজলভ্য প্রাকৃতিক সম্পদ ও কাঁচামাল এবং তাদের পণ্যের বিশাল বাজারের সৃষ্টি করেছে। এজন্যই দীর্ঘ ছয় দশকের অধিক সময় ব্যাপী উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে একের পর এক ঋণ দানের পরেও তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশ কাঙ্ক্ষিত উন্নতির দেখা পায়নি। বরং এইসব উন্নয়নের আশ্বাসে বিশ্বাস স্থাপন করার ফলে উন্নয়নশীল দেশ সমূহ একের পর এক ঋণের বেড়াজালে বন্দি হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতা দরিদ্র গ্রামীণ নারীদের মতো। ক্ষুদ্রঋণ একবার নিলে যেমন তার থেকে বের হয়ে আসা দুরূহ এবং এক এনজিওর ঋণ পরিশোধের জন্য আরেক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ক্রমাগত ঋণের দায়ে ডোবে, একইভাবে দরিদ্র রাষ্ট্রও উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চক্করে পড়ে দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে।


উন্নয়নের নামে সম্পদের শোষণের জাজ্বল্যমান উদাহরণ আফ্রিকার দেশগুলো। পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকার পরেও আফ্রিকার দেশগুলোই চরম দরিদ্র। এর কারণ প্রধানতঃ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে ১৯৭০ আর ১৯৮০ দশকে structural adjustment policy চাপিয়ে দেওয়া। কেউ কেউ হয়তো আফ্রিকান দেশগুলোর স্বৈরশাসকদের ব্যাপক দূর্নীতিকে আফ্রিকার দারিদ্র্যের জন্য দায়ী করবেন। কিন্তু সেটা প্রকৃতপক্ষে ফলাফল, কারণ নয়।


আফ্রিকায় একটা কথা প্রচলিত আছে যে, ‘সাদা ইউরোপীয়রা যখন আমাদের দেশে এসেছিল, তাদের হাতে ছিল বাইবেল আর আমাদের ছিল জমি। এখন আমাদের হাতে বাইবেল আর জিম্মির মালিক সাদা ইউরোপিয়ানরা’। এটি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনকালের প্রেক্ষিতে বলা।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো ধ্বসে পড়লে এশিয়া আর আফ্রিকার উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিগত পাঁচ দশকের উন্নয়ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে এইসব দেশে আবার সাবেক ঐপনিবেশিক রাষ্ট্রসমূহের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। তবে আগের মতো সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে, কারখানার মালিকানা দিয়ে, উৎপাদন ও বিপণন ব্যব্যস্থার মালিকানা দিয়ে, পুঁজি ব্যব্যস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। এনজিওগুলোর পাশাপাশি বহুজাতিক কর্পোরেট এবং এদের দেশীয় সহযোগী ব্যবসায়ী-পুজিপতিদের মাধ্যমে আবার সাবেক উপনিবেশগুলোতে আমেরিকা-ইউরোপের নব্য-উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ঔপনিবেশিক যুগেও যেমন অধিকাংশ মানুষ শুরুতে উপলব্ধি করতে পারেনি কি ধরণের শোষন-বঞ্চনামূলক সমাজব্যবস্থার মধ্যে তারা পড়তে যাচ্ছে, এখনও অধিকাংশ মানুষ মনে করে ব্যবসা-বানিজ্য, শিল্প, ব্যাংক-বীমা, তথা আর্থিক খাত সমূহ ক্রমাগতভাবে পশ্চিমা মালিকানায় যাওয়াটা কোন সমস্যা নয় যদি সেগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্য চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি হয়।


উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, সামাজে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে উন্নতির প্রয়োজন আছে। আর তাই উন্নয়ন কর্মকান্ড যে আশ্বাস দেয়, তার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাও আছে। কিন্তু উন্নয়নের নামে আজ পর্যন্ত যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেগুলো শুধুমাত্র পশ্চিমা পুঁজিপতি ও তার দেশীয় এবং আঞ্চলিক সহযোগীদের স্বার্থ হাসিল করেছে, আর বাদবাকি সকলকে করেছে বঞ্চিত।


উন্নয়ন প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে। তবে উপনিবেশিকতার সামরিক বাহিনী ও সহিংসতা ছাড়াই। আর যেসব জনগোষ্ঠী সরাসরি উন্নয়ন কর্মকান্ডের লক্ষ্যে - শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী - তারা সকলেই অনুধাবন করে উন্নয়নের নামে এই নব্য-উপনিবেশিক বঞ্চনা আর শোষণ। এজন্যই ব্যবসায়ী-এনজিও কর্মী- শহুরে শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত সমাজে একজন ফজলে হোসেন আবেদ ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করে দেশ-বিদেশে পুরস্কৃত হলে, বৃটিশ রাজপরিবারের কাছ থেকে সম্মানসূচক নাইট উপাধি পেলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। কিন্তু যাদেরকে উদ্দেশ্য করে ব্র্যাকের কর্মযজ্ঞ, তাদের মধ্যে কোন সাড়া পড়েনা। একইভাবে, ক্ষুদ্রঋণকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সারা বাংলায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য ডঃ ইউনুস ও গ্রামীণ ব্যাংক নোবেল পুরস্কার পেলে ক্ষুদ্রঋণের থাবার বাইরে থাকা মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত জাতীয় ভাবমূর্তির উন্নয়নে গর্বিত হয়। কিন্তু সেই গর্বে যাদেরকে উদ্দেশ্য করে এই উন্নয়নের ডামাডোল, তাদের না ভরে পেট, আর না কমে দূর্দশা। উল্টো ঘটিবাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়াটাই যেন অনিবার্য পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক সেই আফ্রিকানদের মতো যারা জমির মালিকানা থেকে নিঃস্ব, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে প্রকৃতিক সম্পদে সবথেকে বেশি সমৃদ্ধশালী হয়েও সবথেকে বেশি দরিদ্র।



104 views0 comments

Recent Posts

See All

‘বাঙালি মুসলমানের মন’: গোঁজামিলের এক জ্ঞানবৃক্ষ

১ জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন মাত্রা আছে, আছে তার বিবিধ বহিঃপ্রকাশ। মোটাদাগে, জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে জড়িয়ে থাকা উপাদানগুলোকে আলাদা করা হয় জাতিসত্তা (ethnic membership) এবং নাগরিকতার পরিচয়ের (political membersh

bottom of page