top of page
  • Hasan Mahmud

ঈশ্বর, সমাজ ও ব্যক্তি নিয়ে আমার ভাবনা

Updated: May 22, 2020



সমাজবিজ্ঞানে ধর্মের আলোচনা শুরু করেছেন এমিল ডুর্খেইম (Emile Durkheim) তার Elementary Forms of Religiuos Life গ্রন্থে। এখানে তিনি দাবী করেন যে, সমাজই ঈশ্বর (God of a community is the community itself)।

ডুর্খেইম তার স্বভাবসিদ্ধ বিনির্মাণ (Deconstructive) ধারায় শুরু করেছেন কোনটা ধর্ম নয় তা’ দিয়ে। তিনি বলেন, ধর্ম কোন অতিমানবীয় বা রহস্যময় কোন জিনিস নয়। ধর্ম দেবদেবী বা অন্যকোন স্বত্ত্বায় বিশ্বাসও নয়। মানুষকে অতিপ্রাকৃত ও অস্বাভাবিক ঘটনাসমূহের ব্যাখ্যা দান করাও ধর্মের মূল কাজ নয়। আসলে ধর্মের কাজ হচ্ছে সমাজের সাধারণ ঘটনাগুলোর আপাতঃ গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করা, যেমন রংধনু, ঝড়-বৃষ্টি, ইত্যাদি। তিনি আরো বলেন, জগতের সকল ধর্ম সূর্যের উদয়-অস্তে দেবদেবীদের ভূমিকা স্বীকার করেনা। ধর্মের উৎপত্তি দেখতে গিয়ে ডুর্খেইম অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মধ্যে করা কিছু এথনোগ্রাফিক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, ধর্ম হচ্ছে পবিত্রতা ও অপবিত্রতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতীক (symbols), বিশ্বাস (beliefs) আর আচারের (rituals) এর সমন্বিত একটি ব্যবস্থা (এখানে অপবিত্রতা ‘পবিত্র নয়’ অর্থে, কোন খারাপ অর্থে না)। পবিত্রতা ও অপবিত্রতার এই শ্রেণীবিন্যাস এবং এ’ থেকে উদ্ভূত আচার-আচরণসমূহ (তথা ধর্ম) প্রকৃতপক্ষে জন্ম লাভ করে সমাজের সংহতি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে।

ডুর্খেইম আদিবাসীদের মধ্যে ‘টোটেম’ (Totem) এর ব্যবহার বিশ্লেষণ করে তার তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। টোটেম হচ্ছে সাধারণ কোন বস্তু, প্রাণী বা গাছ যা’ একটা বিশাষ গোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করে। সেইসব গোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের হেয়ারষ্টাইল, হাটার ধরণ, মেক-আপ ইত্যাদি তাদের নিজ নিজ গোষ্ঠীর টোটেম অনুযায়ী করার চেষ্টা করে। যেমন, যাদের টোটেম ক্যাঙ্গারু তারা ক্যাঙ্গারুর মতো হাটাচলা করার অভ্যাস করে। এই টোটেম প্রকৃতপক্ষে উক্ত গোষ্ঠীর সংহতির স্থায়ী প্রতীক হিসেবে কাজ করে; কারণ সংহতির অন্যান্য প্রতীক তুলনামূলকভাবে অস্থায়ী, যেমন- নেতা মৃত্যুবরণ করে, ভৌগলিক অবস্থান বদলায়, ইত্যাদি। টোটেম যত বেশি মনোযোগ (emphasis) লাভ করে, এর গুরুত্বও (significance) ততো বৃদ্ধি পায়। ক্রমশঃ উক্ত গোষ্ঠীর অভ্যাস, আচার, বিশ্বাস, ইত্যাদি তাদের টোটেমকে অনুসরন করে কল্পিত হয়। এভাবে ক্রমশঃ টোটেম হয়ে ওঠে ‘পবিত্র আইকন’। এপর্যায়ে টোটেমের সাথে সম্পর্কিত যেকোন কিছুই পবিত্র বলে গৃহীত হয়, আর বাদবাকি সব কিছু সাধারণ (profane) বলে বিবেচিত হয়।

পবিত্র আইকন টোটেমকে লক্ষ্য করে যাবতীয় বিশ্বাস আর আচারের (তথা পুজা) মধ্য দিয়ে গোষ্ঠির সদস্যদের মাঝে এই বিশ্বাস জন্মে যে, গোষ্ঠী আছে কারণ টোটেম আছে আর টোটেম আছে বলেই গোষ্ঠী আছে; অর্থ্যাৎ গোষ্ঠী আর টোটেম একে অপরের মধ্যে একাকার হয়ে যায়।

পবিত্র বস্তুকে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য সাধারণ বস্তু থেকে আলাদা রাখার জন্য সংরক্ষণ করতে হয়। তাই টোটেমকেও সংরক্ষণ করতে ‘পবিত্র স্থান’ নির্দিষ্ট করা হয়। এইসব স্থান পবিত্র আইকনের প্রভাবে এতটাই পবিত্র (সংরক্ষিত) হয়ে ওঠে যে, এগুলো শত্রু বা শিকারের পশুপাখির জন্য অভয়াশ্রমে পরিগণিত হয় (ক্বাবা শরীফের ‘হারাম’ নামকরণ স্মরতব্য)। বিশেষ বিশেষ বস্তু ও স্থানের এই যে পবিত্রতা (sacredness) তা’ সেই বস্তু বা স্থানের কারণে নয়, তা’ এই কারণে যে সেই বস্তু (তথা টোটেম) সমগ্র গোষ্ঠীকে রিপ্রেজেন্ট করে; অর্থ্যাৎ পবিত্রতা আসে সকলের গোষ্ঠীবদ্ধ তথা সামাজিক অস্তিত্ব হতে। অতএব, টোটেম এবং তা’ সংরক্ষণ করার স্থানকে (এবং এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য সবকিছুই) সম্মান করা, পুজা করা প্রকৃতপক্ষে নিজ নিজ গোষ্ঠী তথা সমাজকেই সম্মান করা, পুজা করা। এইখান থেকেই ডুর্খেইম এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, সমাজই ঈশ্বর। অর্থ্যাৎ ধর্ম পালন করার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতপক্ষে তার নিজ সমাজেরই উপাসনা করে।

সমাজরূপ এই ঈশ্বর যদি সমাজ তথা ব্যক্তি মানুষের সংঘবদ্ধ সামাজিক অস্তিত্বই হয়ে থাকে, তাহলে এই ঈশ্বরের উপাসনা মানে সমাজের সংঘবদ্ধ অস্তিত্বের উপাসনা; অর্থ্যাৎ, সামাজিক সংহতির উপাসনা। তারমানে, যাবতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, ইত্যাদির লক্ষ্য মূলতঃ সামাজিক সংহতি।

সমাজের এই ঐশ্বরিক অস্তিত্ব আরেক ভাবেও উপলব্ধি করা যায়ঃ প্রত্যেক সমাজেই ‘সামাজিক বিবেক’ (Collective Consciousness) আছে যা’ একটি নির্দিষ্ট সমাজের সদস্য হিসেবে সকল ব্যক্তিকে মেনে চলতেই হয়। এই সামাজিক বিবেকের অন্তর্গত বিশ্বাস, মতামত, নৈতিকতা, আদেশ-নিষেধ, ইত্যাদি আসলে সমাজেরই Collective Living এর বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তব প্রয়োজনের উপলক্ষ্যে উদ্ভূত (কুরআনের আয়াতসমূহের শানে-নুযূল বিবেচ্য)। যে বক্তি সমাজের সাথে যত বেশি সংযুক্ত, তার মধ্যে এই সবকিছু তথা সামাজিক বিবেকও বেশি ক্রিয়াশীল। সমাজের সাথে ব্যক্তির নৈকট্য এতো বেশি, সামাজিক বিবেকের প্রভাব ব্যক্তির উপর এতো বেশি যে, ব্যক্তি মনে করে এইসব বিশ্বাস, আদেশ-নিষেধ, নৈতিকতা, ইত্যাদি তার নিজের উপলব্ধিগত নয়, এগুলো বাইরে থেকে কেউ নিয়ে এসেছে। আদতে এই সামাজিক বিবেক তার গোষ্ঠীই তার উপর চাপিয়ে দেয়। অতএব, ব্যক্তি যে বিবেক বা নৈতিকতার কাছে দায়বদ্ধ, তা’ আকাশে অবস্থানকারী কোন ঈশ্বর নয়, তা’ তার সমাজেরই। ব্যক্তির সামাজিক পরিচিতি তথা সমাজে তার অবস্থানও প্রভাবিত হয় উক্ত ব্যক্তি সামাজিক বিবেকের দায়বদ্ধতা মেনে নিচ্ছে কি না তা’ দিয়ে। অর্থ্যাৎ, কেউ সামাজিক বিবেক বা নৈতিকতা অনুসরণ করলে তাকে ভালো মানুষ বলা হয় (যা’ সকলেরই কাম্য) আর অমান্য করলে তাকে বলা হয় অসামাজিক (পতিত, নষ্ট, ইত্যাদি যা’ সাধারণভাবে কেউ কামনা করেনা)।



আমরা জানি, সব ধর্মেই ঈশ্বর নিয়ন্ত্রনকামী- সে নিজ নিজ অনুসারীদেরকে নির্ধাতির পথে পরিচালিত করার প্রয়াস পায়। যেসব ব্যক্তি ঈশ্বরের নির্দেশিত পথে চলে তারা পুরষ্কার পায়, আর যারা বিপথগামী হয় তারা শাস্তি পায়। ঈশ্বরের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করলে ইহকাল-পরকালে আসে সুখ-শান্তি; বিপথে গেলে অনিবার্য ধ্বংস। – এই এনালোজিতে ঈশ্বরের স্থলে ‘সমাজ’কে প্রতিস্থাপন করে দেখা যাক কি পাওয়া যায়।-

আধূনিক শিল্প সমাজের মূল চালিকা শক্তি হলো মানুষের শ্রম। আর তাই ব্যক্তির জন্য এই সমাজ তথা ঈশ্বরের নির্দেশিত সঠিক পথ হলো নিয়মিত কাজ করা। একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কাজের মধ্যে ডুবে থাকবে, কাজের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করবে। আর মানুষকে এই কর্মময় পথে চালিত করার টেকনিক হলো work ethic যা’ উদ্ভূত হয়েছে ইউরোপে, শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে।

Zygmunt Bauman তার Work, Consumerism and the New Poor (2005) গ্রন্থে সংক্ষেপে চারটি অনুসিদ্ধান্তের মাধ্যমে work ethic-কে ব্যাখ্যা করেছেনঃ ১। সুখী এবং সন্তুষ্ট হওয়ার জন্য যা’ কিছু প্রয়োজনীয় তা’ পেতে হলে ব্যক্তিকে এমন কিছু কাজ করতেই হবে যা’ অন্যরা মূল্যবান এবং অর্থের মাধ্যমে বিনিময়যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে; ২। যেটুকু আছে তা’ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা এবং আরো বেশি কামনা না করা ভুল, বোকামী, নৈতিকভাবে ক্ষতিকর। কর্মময়তা নিজেই একটা মূল্যবোধ, একটা মহৎ ব্যাপার। কর্মই জীবন। আর তাই কর্মের মধ্যে নিজেকে সর্বাত্মক নিংড়ে না-দেওয়াটা জীবনের অপচয় যা’ প্রকারান্তরে অযৌক্তিক।

– এই দুই থেকে যে ঐশ্বরিক আদেশটা নাযিল হয়, তা’ হলোঃ কাজে যাও, এমনকি যদি তুমি না-ও দেখতে পাও সেই কাজের মাধ্যমে তুমি নিজের সুখ ও সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে কি কি পেতে পারো। কারণ, কর্মময়তা ভালো আর কর্মহীনতা খারাপ।

৩। প্রত্যেক মানুষের কাজ করার ক্ষমতা আছে যা’ বিক্রয়যোগ্য এবং অনেকেই তাদের সেই ক্ষমতা বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। ব্যক্তির মালিকানায় যা’ আছে তা’ তার পূর্বের কর্ম এবং ভবিষ্যতে কাজ করার ইচ্ছের মাধ্যমে অর্জিত। বেশিরভাগ মানুষই তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। আর তাই যারা কোন কারণে কাজ করতে ব্যর্থ তাদের জন্য কর্মঠদের সম্পদ বা মুনাফা থেকে কোন কিছু আকাঙ্ক্ষা করা অন্যায্য। ৪। প্রকৃত কাজ হচ্ছে কেবলমাত্র সেই কর্ম যাকে অন্যরা মূল্যবান বলে বিবেচনা করে, যাকে কেনা ও বেচা যায়। বাদবাকি সব সময় ও কর্মক্ষমতার অপচয়।

– শিল্পযুগের আগে কয়েকশ’ বছর ধরে মানুষ মূলতঃ কৃষিভিত্তিক জীবন যাপন করেছে যেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে সারা বছর কাজ করার প্রয়োজন ছিলোনা; ফসলের মৌসুমে কাজ করেছে আর মৌসুম শেষ বিশ্রাম করেছে। কিন্তু এভাবে ত শিল্প কারখানা চলে না। শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করতে হয়, সারা বছরই। তাই শিল্পায়নের প্রাথমিক যুগে মানুষকে Work Ethic বা নৈতিকতার মাধ্যমে সারা বছর কারখানায় কাজে উদ্‌বুদ্ধ (প্রকৃত পক্ষে বাধ্য) করা হয়েছে।

কিন্তু মানুষকে একটা বিদ্যমান জীবনধারা থেকে নতুন ধরনের জীবনে নিয়ে আসতে শুধু নৈতিকতা যথেষ্ট ছিলনা। সেই নৈতিকতাকে উপযুক্ত বস্তুগত সামাজিক অবস্থার (Objective social condition) মধ্য দিয়ে প্রয়োগ করতে হয়েছে। লংগরখানার (poor house) বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সামাজিক অবস্থার রূপ উপলব্ধি করা যায়ঃ

লংগরখানায় শুধ্যমাত্র ‘প্রকৃত গরীব’দের আশ্রয় দেওয়া হয়। এখানে একটা ব্যাপার নিশ্চিত করা দরকার ছিলো যে অলস ব্যক্তিরা যেন নিয়মিত শ্রম এড়িয়ে থাকার জন্য সেখানে আশ্রয় না পায়। তারমানে, প্রকৃত গরীবদের চিহ্নিত করে সেখানে আশ্রয় দিতে হবে। কিন্তু প্রকৃত গরীব চিহ্নিত করার ত’ কোন সহজ উপায় নাই। এ কারণে একটা পরোক্ষ পদ্ধতি বেছে নেওয়া হলো- লংগরখানায় থাকার পরিবেশ, খাবার-দাবার, অন্যান্য সুবিধা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে কোন রকমে শুধু জীবন বাঁচানো যায়। সেখানকার জীবন এতোটাই দুর্বিষহ করে ফেলা হলো যেন কেউ সেখানে আশ্রয় নেওয়ার আগে বারবার ভেবে দেখা বাইরের সমাজে তার কোন ভাবে বেঁচে থাকার উপায় আছে কি না। আর লংগরখানার ভিতরকার এইসব ভয়াবহ জীবনের কাহিনী বাইরে যত বেশি ছড়িয়ে পড়তে থাকে, লংগরখানার মধ্যকার জীবন ততোই অমানবিক হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। এভাবে এই ধারণা দৃঢ় হয় যে, লংগরখানার জীবন মানবেতর তথা সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্য নয়। অতএব, যারা লংগরখানায় আশ্রয় নেয়, তারা মানুষ পদবাচ্যই নয়।

এই পর্যায়ে ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় নির্ধারণে সমাজের প্রভাব ঐশ্বরিক রূপ লাভ করে। ঈশ্বর যেমন নির্ধারণ করেন কে স্বর্গে যাবে আর কে নরকবাসী হবে, সমাজও তেমনি ঠিক করে দেয় কে স্বাভাবিক তথা সামাজিক জীবনযাপন করবে আর লংগরখানার দূর্দশায় নিপতিত হবে। ঈশ্বর যেখানে পূণ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তির মাঝে বিভাজন করেন, সমাজ করে নিয়মিত কর্ম এবং কর্মে সদিচ্ছার মাধ্যমে। যারা নিয়মিত কর্মে নিয়োজিত তারাই মানুষ, আর যারা কর্মহীন (তা’ সে যেকোন কারণেই হোক) তারা অসম্পূর্ণ মানুষ (পতিত, দূর্দশাগ্রস্থ, অপরের অনুগ্রহভোগী)।

কর্মপ্রিয় ঈশ্বরের এই সমাজে ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান নির্ণীত হয় তার কর্মের মধ্য দিয়ে। যে ব্যক্তি যে ধরণের কাজে নিয়োজিত, তার সামাজিক মর্যাদা তথা সামাজিক অবস্থানও সেই রকম। যেমন, একজন কারখানা-শ্রমিকের অবস্থান তার মতো কর্মে নিয়োজিত অন্যান্য শ্রমিকের মতো। আবার একজন উচ্চপদস্থ ম্যানেজারের অবস্থান অন্যান্য ম্যানেজারদের সাথে। এই ভাবে ছোট ব্যবসায়ী অন্য ছোট ব্যবসায়ীর সাথে, শিক্ষক অন্যান্য শিক্ষকের সাথে, একেক পেশাজীবি সেই নির্দিষ্ট পেশার অন্যান্যদের সাথে একই সামাজিক অবস্থানে থাকে। এইরূপ সামাজিক স্তরবিন্যাসের ফলে সমাজের সামগ্রিক সংহতি বজায় থাকে। সঙ্গী-সাথী দিয়ে ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় নির্ধারণের কারণে ব্যক্তি সচেষ্ট থাকে সমাজে সুস্থ-স্বাভাবিক হিসেবে স্বীকৃত লোকজনের সাথে একই দলে থাকতে। এজন্য সকলেই দলের এবং সেই সাথে বৃহত্তর সমাজের নৈতিকতা মেনে চলে। আর যারা তা’ মেনে চলে না বা চলতে পারেনা, তারা হয় সমাজচ্যুত।

এইভাবে ঈশ্বররূপী সমাজ এই বার্তা শিল্পসমাজের সকল সদস্যকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, তার পছন্দের বান্দারা তারাই যারা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কর্মে নিয়োজিত থাকবে। আর কেবলমাত্র তারাই সফলকাম। এর বাইরে বাকি সবাই বিপথগামী; আর তারা নিক্ষিপ্ত হবে স্বাভাবিক সমাজের বাইরে (লংগরখানায়, ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে, জেলখানায়, পাগলাগারদে)।

কাজেই, সুস্থ-স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপনের জন্য ঈশ্বরের নির্দেশে আমাদেরকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যেতেই হয়। ঐশ্বরিক এই আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা স্বাভাবিক জীবন কামনা করে এমন কারো নেই। যারা এই আদেশ যথাযথ ভাবে মেনে চলবে, তারা সমাজে উন্নতি করবে, উচ্চ মর্যাদায় আসীন হবে। অন্যদিকে যারা এই আদেশ অমান্য করবে, তারা কর্মপ্রিয় এই ঈশ্বরের কোপানলে পড়ে সমাজের বাইরে নিক্ষিপ্ত হবে (তথা marginalized হবে)।


মোটামুটি ভাবে আমরা সবাই জানি যে, এখনকার সমাজটা হচ্ছে ভোগবাদী সমাজ (consumer society) যেখানে স্বাভাবিক ভাবে আমরা সবাই ভোক্তা (consumer)। আর ভোগ করা বলতে বুঝি খাবার জিনিস খেয়ে ফেলা, পরিধানের পোষাক হলে তা’ পরে ফেলা, খেলার সরঞ্জাম হলে তা’ দিয়ে নির্দিষ্ট গেমটা খেলে ফেলা, ইত্যাদি; অর্থ্যাৎ যে কাজের জন্য যে জিনিস, তা ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা। আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সক্ষম যেকোন জিনিস পেতে হলে আমাদেরকে টাকা খরচ করতে হয়, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ইপ্সিত জিনিসটি কিনতে হয়। আমরা যখন জিনিসটি টাকার বিনিময়ে কিনে ফেলি তখন তা আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়, ফলে অন্য কেউ তা মালিকের অনুমতি ছাড়া নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যবহার করতে পারেনা।

ভোগের আরেক অর্থ হচ্ছে ধ্বংস করা, আক্ষরিক অর্থে, প্রতীকি অর্থেও। যেমন, আমরা কোন খাদ্য খেয়ে ফেললে তা’ আক্ষরিক অর্থেই নিঃশেষ হয়ে যায়, কোন বস্ত্র পরিধান করলে তা’র উপযোগ বা আকাঙ্ক্ষা পূরণের ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যায়, কোন গানের সিডি বারবার বাজালে তা’র উপযোগও ক্রমশঃ নিঃশেষ হয় (অর্থ্যাৎ প্রতীকি অর্থে ধ্বংস হয়)।

দুটো বিষয় এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার- এক, ভোগবাদী সমাজে আমরা সবাই কমবেশি ভোগ করি, করতেই হয়। কিন্তু আমরা কি শুধু ভোগই করি? আর পূর্বের সমাজে কি মানুষ ভোগ করতো না, শুধু কর্মই করতো?- আসলে কর্ম ও ভোগ উভয়ই সমাজে সর্বদা বিদ্যমান। কিন্তু আগের সমাজে কর্মপ্রিয় ঈশ্বর প্রধানতঃ কর্মের মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান নির্ধারণ করতো, আর বর্তমান সমাজে সেটা করে প্রধানতঃ ভোগের মাধ্যমে। আগে যেমন কর্মের মর্যাদা সেই কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তির মর্যাদা নির্ধারণ করতো, এখন ভোগকৃত জিনিসের (পণ্য+সেবা) মর্যাদাসেটা নির্ধারণ করে। দুই, কর্মের মাধ্যমে ব্যক্তি যে কর্মজীবন পেত তা’ ছিল স্থায়ী, (‘lifelong career’) এর মাধ্যমে যে সামাজিক পরিচিতি (অবস্থান+মর্যাদা) লাভ করতো তা যথারীতি স্থায়ী হতো। কিন্তু ভোগ্যপণ্য (consumer goods) বাই ডিফল্ট স্বল্পায়ু এবং পরিবর্তনশীল। আর তাই এসব পণ্য ভোগের মাধ্যমে ব্যক্তি যে সামাজিক পরিচিতি (অবস্থান+মর্যাদা) অর্জন করে তা-ও ক্ষণস্থায়ী এবং পরিবর্তনশীল।

শিল্প সমাজের কর্মপ্রিয় ঈশ্বর মানুষকে নিয়মিত কাজে যেতে বাধ্য করতো Work Ethic তথা নৈতিকতার মাধ্যমে। কিন্তু ভোগবাদের ঈশ্বর ব্যক্তিকে ভোগে বাধ্য করে নৈতিকতা দিয়ে নয়, সম্মোহনের (seduction) মাধ্যমে। অনাস্বাদিত জিনিসের প্রদর্শনী, পূর্বে না-পাওয়া ইন্দ্রীয়সুখের আশ্বাস মানুষকে প্রবল্প ভাবে অকর্ষন করে ভোগের দিকে। আর এই ভাবে ব্যক্তিকে আকর্ষনের মাধ্যমে সম্মোহিত করার জন্য সমাজ ব্যক্তির সামনে ভোগ্যপণ্য সম্পর্কিত তথ্যকে প্রতিমূহুর্তে হাজির করে আরো নতুন, আরো আকর্ষনীয় ভাবে। এইখানে ভোগ্যপণকে আস্বাদন করাটা ব্যক্তির সামনে অধিকার (consumer right) হিসেবে দেখা দেয়, যেখানে পূর্বে কর্মে নিয়োজিত থাকাটা ছিল নৈতিক দায়িত্ব (moral duty)।

ব্যক্তির অধিকার (right) কেউ দাবী না করলে নৈতিক ভাবে সেটা নিতে তাকে বাধ্য করার কোন উপায় নাই। একারণে ভোগবাদের ঈশ্বর একটা নতুন উপায় উদ্ভাবন করে, এটা হলো নান্দনিক বোধ (asthetic interest) যা ব্যক্তিকে ভোগ্যপণ্যের প্রতি সম্মোহিত করে রাখে। ভোগবাদী সমাজে ব্যক্তির সামাজিক পরিচয় নির্ধারিত হয় তার নান্দনিক বোধের ভিত্তি’তে যা’ সাধারণভাবে smartness হিসেবে পরিচিত। এই সমাজে যে যত বেশি মর্যাদাসম্পন্ন ভোগ্যপণ্য ভোগ করবে, সে ততো বেশি স্মার্ট তথা উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। স্বাদে প্রায় একই রকম হওয়া সত্বেও KFC-র চিকেনফ্রাই আর ঢাবি’র চারুকলার গেটে রাস্তার পাশের চিকেনফ্রাই মর্যাদায় আলাদা, ফলে তাদের ভোক্তাদেরও সামাজিক পরিচিতি (অবস্থান+মর্যাদা) আলাদা। গুণে-মানে কাছাকাছি হওয়ার পরেও ওয়েষ্টেকস এর জিন্‌স আর ওডিসির (Opposit to Dhaka College) জিন্‌সের মর্যাদা এবং ফলশ্রুতিতে তাদের ব্যবহারকারীদের মর্যাদা আলাদা।

ভোগবাদী সমাজে ঐশ্বরিক আদেশ হচ্ছে ভোগ করা, যত বেশি ভোগ ততো বেশি ঈশ্বরের কাছাকাছি তথা সমাজে উচ্চমর্যাদা। এই ঈশ্বরের পছন্দনীয় ব্যক্তি হলো একজন ভোগী যে অগণিত সুখময় ও উচ্ছ্বল ভোগের উপকরণ থেকে তার ইচ্ছে (এবং আর্থিক সামর্থ) অনুসারে অবিরাম ভোগে লিপ্ত। এখানে সুখী জীবন মানে হচ্ছে সব থেকে বেশি আকর্ষনীয়, বেশি ইপ্সিত, বেশি আলোচিত ভোগ্যপণ্যগুলো বাজারে আসার সাথে সাথেই ভোগ করা, সম্ভব হলে অন্য কারো আগেই। আর ভোগ করতে না-পারা হলো অস্বাভাবিক জীবন। অর্থ্যাৎ, ঈশ্বরের অপছন্দীয়। আর এমন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদাও তাই শূণ্যের কোঠায় যাকে আমরা সাধারণভাবে বলি আনস্মার্ট বা ‘খ্যাত’।

পূর্বের সমাজে ব্যক্তির নিয়মিত কর্মে নিয়জিত থাকার ইচ্ছেকে নিশ্চিত করে নৈতিকতা; কাজে লিপ্ত থাকাটা ব্যক্তির নৈতিক দায়। আর এই সমাজে অবিরাম ভোগের ইচ্ছেকে নিশ্চিত করে স্মার্টনেস। এখানে নৈতিকতা অপ্রয়োজনীয়। একারণে ভোগের জন্য আবশ্যক টাকা কি উপায়ে আসে তা’র তুলনায় টাকা থাকাটাই মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তা’ সে যেভাবেই অর্জিত হোক। পূর্বের সমাজে যেমন কেউই কাজ না করে অলস বসে থেকে কর্মপ্রিয় ঈশ্বরের বিরাগভাজন হতে চায়না, তা’ সেই কর্মের ফল যা’ই হোক, ঠিক একই ভাবে এই সমাজে ভোগ না করে কেউ ভোগবাদী ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যেতে চায়না, তা’ সেই ভোগ্যপণ্য কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা যেভাবেই অর্জিত হোক। ভোগবাদী ঈশ্বর শুধুমাত্র ব্যক্তির ভোগেই আগ্রহী, অন্য কিছু নয় (উদাহরণ ত আমাদের আশেপাশেই আছে)।



উপরে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম ঈশ্বরের (আসলে সমাজের) দুটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ- কর্মপ্রিয় ঈশ্বর আর ভোগপ্রিয় ঈশ্বর। ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়ে (অবস্থান ও মর্যাদা) তাদের ভূমিকাও খানিকটা বর্ণনা করলাম। এখন দেখা যাক, খোদ সমাজের উপর এদের প্রভাবটা কি রকম, অর্থ্যাৎ এই ঈশ্বরদ্বয়ের নিজেদের ভবিষ্যত কি।

আগেই বলেছি, কর্মপ্রিয় ঈশ্বরের কাছে কেবলমাত্র সেইসব কর্মই কাজ বলে স্বীকৃত যা’ অন্যদের জন্য উপকারী তথা অন্যরা যা মূল্যবান মনে করে এবং তার বিনিময়ে টাকা খরচ করতে রাজী থাকে। এই জাতীয় কর্ম বাই ডিফল্ট সম্মলিত (Collective)। শ্রমিক কারখানায় অন্য অনেকের সাথে একত্রে কাজ করে; এমনকি বাড়িতে ফেরার পথে, বাড়িতে, আবার কারখানায় যাওয়ার পথেও তারা একত্রিত। অর্থ্যাৎ, শ্রমিকরা কাজের মধ্যে একত্রিত, আবার কাজের বাইরে অবসরেও। আর তাদের কর্মের ফলাফল হচ্ছে অন্যদের চাহিদা পূরণে সক্ষম পণ্যের উৎপাদন যা টাকার বিনিময়ে বিক্রয়যোগ্য।

কিন্তু ভোগপ্রিয় ঈশ্বরের কাছে ভোগই মূখ্য। আর এই ভোগ বাই ডিফল্ট ব্যক্তিগত (Individual) ব্যাপার। ব্যক্তি যখন কোন কিছু ভোগ করে, তা’ সে একা একাই করে। এই ভোগের জন্য সে পণ্যকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করে। সম্মিলিত ভাবে কিছু ভোগের সুযোগ আছে বটে (যেমন, বিয়ের দাওয়াত), কিন্তু তা’ ব্যক্তিগত মর্যাদায় খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে। তাই মূল্যবান বা গুরুত্বপূর্ণ ভোগ কেবলমাত্র সেইগুলো যা’ ব্যক্তিগত, যা’ ভোক্তাকে অন্যদের থেকে আলাদা মর্যাদা দান করে।

অতএব, দেখা যাচ্ছে যে, কর্মপ্রিয় ঈশ্বর কর্ম করতে বাধ্য করার মাধ্যমে মানুষকে সংঘবদ্ধ করে। এটা মূর্ত হয়ে ওঠে এই ঈশ্বরের সমাজে দৃঢ পারিবারিক মূল্যবোধ, সমবায়ভিত্তিক সংগঠন, ইত্যাদির প্রাধান্যে। আর ভোগপ্রিয় ঈশ্বর ভোগ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রীক করে ফেলে। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভোগবাদী সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধের ভেঙ্গে পড়ায়, সমবায়ভিত্তিক সংগঠনের স্বল্পতায়, নিতান্ত ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার প্রবণতার মধ্যে।



আমাদের সমাজে দুই ঈশ্বরই বিরাজমান; অর্থ্যাৎ আমাদের সমাজে নৈতিক মূল্যবোধও লোপ পায়নি, আবার ভোগের প্রবণতাও লক্ষ্যনীয়। তবে একথা না মেনে উপায় নেই যে, বর্তমানে নৈতিকতার জোর ক্রমশঃ কমছে আর ভোগের প্রবণতা বাড়ছে। তারমানে কর্মপ্রিয় ঈশ্বরের তুলনায় ভোগপ্রিয় ঈশ্বরের প্রভাব বাড়ছে। এই পরিবর্তনটা ধরা পড়ে স্থায়ী কর্মের ক্রমঃহ্রাসমান আকর্ষন (যথা সরকারী চাকুরী), নৈতিকতার অবক্ষয় (সুদ-ঘুষ-দালালীর মাধ্যমে উপার্জনকে গ্রহনযোগ্য হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া), নিত্যনতুন ভোগ্যপণ্যের (দ্রব্য ও সেবা) আগমন, ইত্যাদির মধ্যে।

প্রশ্ন হলো- দুই ঈশ্বরের মধ্যে আমি কাকে অনুসরণ করবো?- উপরের আলোচনা আমলে নিলে ক্রমঃবর্ধমান হারে ক্ষমতা অর্জনকারী ভোগপ্রিয় ঈশ্বরকেই পুজা দিতে হয়, তথা ভোগে মনোনিবেশ করতে হয়। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে ভোগে লিপ্ত হতে হলে নৈতিকতাকে সম্পূর্ণরূপেই ছুঁড়ে ফেলতে হয়। কারণ, ভোগ ব্যক্তিগত; আর তাই এই আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, স্বদেশী সবাইকে বাদ দিয়েই চিন্তা করতে হয়। কারণ, তাদের চিন্তা মাথায় রাখলে তাদের জন্যও খরচ করতে হবে যা’র ফলে নিজের ভোগের সুযোগ এবং ক্ষমতা কমে যাবে।

কিন্তু কর্মপ্রিয় ঈশ্বর এখনো বিদ্যমান, নৈতিকতা এখনো মিলিয়ে যায়নি। আর তাই আমি এখনো ভুলতে পারিনা অন্যান্য সকলের কথা, তাদের প্রতি আমার দায়দায়িত্বের কথা (আমার বিশ্বাস, প্রায় সকল এক্স-ক্যাডেটই এমন)। কাজেই, এখনো আমি কর্মপ্রিয় ঈশ্বরেরই পুজা করি, তথা অন্যদের চোখে মূল্যবান কর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। এর ফলে ভোগপ্রিয় ঈশ্বর স্বভাবতঃই আমার প্রতি রূষ্ট, আমার সামাজিক অবস্থানও তাই ভোগবাদী এই সমাজের নিচুতলায়। আমি তাদের দলভূক্ত যাদেরকে বলা হয় আনস্মার্ট বা ‘খ্যাত’, যাদের সাথে ভোগপ্রিয় ঈশ্বরের পুজারী স্মার্ট-ভদ্রলোকেরা ওঠাবসা করতে অনিচ্ছুক। এই নিচু সামাজিক পরিচয়ই অনেক (আসলে বেশিরভাগ) ব্যক্তিকে ভোগপ্রিয় ঈশ্বরে পুজায় ঠেলে দেয়, ভোগে বাধ্য করে।

আমি ভোগবাদের ঈশ্বরকে পুজা দিতে চাইনা। কারণ, আমি জানি আমার আজকের এই আমি হয়ে ওঠার পেছনে ভোগবাদের ঈশ্বরের কোন ভূমিকা নেই, এর পুরো কৃতিত্ব কর্মপ্রিয় ঈশ্বরের যে আমার পরিবারকে (রাষ্ট্রকেও) আমার পড়াশোনার জন্য অপরিমেয় ত্যাগে উদ্‌বুদ্ধ করেছে, আমার আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং অন্যান্যদের মনে আমার প্রস্তুতিপর্বে আমার জন্য সহানুভূতির উদ্রেক করেছে। আমি এদের সকলের কাছে ঋণী। আমার নৈতিকতা আমাকে তাদের সকলের অবদানের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাকে উদ্‌বুদ্ধ করে এমন কিছু কর্ম করার যা’ অন্যদের কাছে মূল্যবান, যা’ থেকে অন্যরাও উপকৃত হবে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ভোগে এইজন্য আমি মনোনিবেশ করতে পারিনা।

হে ভোগের ঈশ্বর, আমি শুধুমাত্র ভোগের পুজা দিতে অপারগ। আমায় মাফ করো। আর তা’ না করলেও আমার খুব একটা সমস্যা নাই। কারণ, ‘খ্যাত’ পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে আমি ভয় পাইনা।


89 views0 comments

Recent Posts

See All

‘বাঙালি মুসলমানের মন’: গোঁজামিলের এক জ্ঞানবৃক্ষ

১ জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন মাত্রা আছে, আছে তার বিবিধ বহিঃপ্রকাশ। মোটাদাগে, জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে জড়িয়ে থাকা উপাদানগুলোকে আলাদা করা হয় জাতিসত্তা (ethnic membership) এবং নাগরিকতার পরিচয়ের (political membersh

Comments


bottom of page