top of page
  • Hasan Mahmud

পোষ্টমডার্নিজম বিষয়ে আমার উপলব্ধি



১৯৯৭ সালের কথা।

ঢাবি'তে পড়তে আইস্যা ঘটনাক্রমে পরিচিত হইছিলাম কিছু আঁতেল বড়ভাইয়ের সাথে যারা দেখি সব তাত্ত্বিকের কঠিন সমালোচনার পাশাপাশি চলমান সবকিছুরই 'জটিল' সব নতুন নতুন ব্যাখ্যা দেয়। যেমন, একদিন বিকেলে মধূর ক্যান্টিনে বসে আড্ডা মারার সময় এক ভাই কইলেন যে, আর্সেনিক গবেষনায় মূল লাভ হইছে কর্পোরেটগুলার। দেশ থেকে আর্সেনিক মোটেও দূর হয় নাই, কেবল পাত্তিওয়ালা জনগণের মধ্যে ভয় ঢুকানো গেছে যে বিনে পয়সায় পাওয়া পানি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কাজেই, বাঁচতে হলে পানি কিনে খাইতে হবে। এর মাধ্যমে গণস্বাস্থ্যের কতটা উন্নতি হইছে সেই হিসাব বাদ দিয়ে তিনি আমাদেরকে বোঝানো শুরু করলেন কিভাবে কর্পোরেট বানিজ্য এক টাকায় পানি বোতলে ভরে ৭/৮ টাকায় বিক্রি করার একটা নতুন বাজার তৈরী করে ফেলছে।- আমি ত পুরা টাস্কিফায়েড! আরে, এইটা ত ভাইবা দেখি নাই।


- তিনি যে ধারায় চিন্তা ও বিশ্লেষনটা করছিলেন, তাকে সহজভাবে বলা যায় deconstraction। এইটা ফরাসী দার্শনিক জ্যাক দেরিদা'র (Jacques Derrida) সবথেকে প্রভাবশালী চিন্তাধারা যা বর্তমান সামাজিক ও মানবিক বিজ্ঞানের জগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনছে। নতুন এই যুগটা কি? - এটাই হইলো পোষ্টমডার্ন, অর্থ্যাৎ উত্তরাধূনিক যুগ, আর এর বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি পোষ্টমডার্নিজম বা উত্তরাধূনিকতা।


Deconstraction বা বিনির্মান জ্ঞানচর্চা+আমাদের পারিপার্শ্বিককে বোঝার একটা বিশেষ পদ্ধতি যা সমাজে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিসমূহের মধ্যে অবস্থিত নানা বৈপরীত্যকে উন্মোচন করে (সহজ বাংলায় যেইটাকে আমরা বলি ল্যাংটা করা)। এই পদ্ধতি যেকোন প্রথাগত আচার-বিশ্বাস-যুক্তি-আইনের উদ্দেশ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যকার বৈপরীত্যকে সিষ্টেম্যাটিক্যালী তুইলা ধরে। যেমন, গণতন্ত্র সমানাধিকারের স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু নিশ্চয়তা দেয় না। আধূনিক বিজ্ঞান মানবতার অগ্রযাত্রার আশ্বাস দেয়, কিন্তু মানবাধিকার হরণে বাঁধা ত দেয়ই না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আধূনিক রাষ্ট্র সকল নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণের আশ্বাস দেয়, কিন্তু বিশ্বব্যাপী ক্রমঃবর্ধমান দারিদ্র্যের মুখেও রাষ্ট্র ক্রমাগত নিজের (welfare spending) হাত গুটায়া নেয়। (এরকম আরো অসংখ্য উদাহরন আছে)। এই পদ্ধতি বঞ্চিত+নির্যাতিত মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করলেও সংগত কারণেই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার দ্বারা প্রবলভাবে প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়।


বিশেষ করে সত্তরের দশক থেকে ক্রমাগতভাবে বাইড়া চলতেছে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের বঞ্চনা। গণমানুষের এই বঞ্চনার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে তাই বাড়ছে পোষ্টমডার্নিজমের গ্রহনযোগ্যতা। একারণেই মূলতঃ সমালোচনামূলক শিল্প-সাহিত্যের গন্ডি ছাড়িয়ে পোষ্টমডার্নিজমের আবেদন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। তাই যেখানেই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অনাস্থা ও প্রতিবাদ, সেইখানেই পোষ্টমডার্নিজম।আধূনিকতার নিবর্তনবাদী রূপ উম্মোচন পোষ্টমডার্নিজমের সবথেকে বড় সাফল্য। এটা বাস্তব অভিজ্ঞতার বিশ্লেষনের মাধ্যমে দেখায়া দেয় যে, আধূনিকতা'র ভিত্তি - সার্বজনীনতা - আসলে সার্বজনীন নয়, তা' ভাগ্যবান কিছু মানুষের জন্য।


কিন্তু পোষ্টমডার্নিজমের সবথেকে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এইটা বিকল্প কোন সমাজের আশ্বাস দিতে ব্যর্থ। এইটা বিদ্যমান সমাজকাঠামোকে শুধু ভাঙ্গেই, তদস্থলে নতুন কিছু গড়ে না। একারণে অনেক বিজ্ঞানীই পোষ্টমডার্নিজমমে পরিত্যাগ করছেন।


কিন্তু তারপরেও পোষ্টমডার্নিজমের প্রয়োজন আছে আমাদের মননে 'আধূনিক কূপমন্ডুকতা'র শৃংখল ভাইঙ্গা ফেলায়। আধূনিক শিক্ষা আমাদের মনকে মুক্ত করার বদলে একটা বিশেষ ধারায় চিন্তা করতে অভ্যস্ত করে যা আমাদেরকে বিনাবাক্যে বিশেষ কিছু আচার-যুক্তি-আইনকে স্বাভাবিক বলে ভাবতে শেখায়। তবে পোষ্টমডার্নিজমের থেকে শিক্ষা নিয়া আমাদের জীবনকে আগায়া নিতে হলে অবশ্যই জানতে হবে কোন কোন প্রেক্ষিতে পোষ্টমডার্নিজমের উদ্ভব+বিকাশ হয়। তারমানে, আধূনিকতা কি কি উপায়ে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরী করে- ক্ষমতায়, সম্পদে, ভোগে।


পোষ্টমডার্নিজম বিষয়ে ইন্টারনেটে অসংখ্য তথ্য আছে, তাই এর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না। আমি সরাসরি ইতিহাসের আলোকে পোষ্টমডার্নিজমের বস্তুগত সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার চেষ্টা করবো।-


কোন সামাজিক মতবাদই সমাজের বাইরে থেকে আসে না। সমাজের মধ্য থেকেই তা'র উদ্ভব হয়। আর ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ ক্ষণে মানুষের পারস্পারিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তা বিশেষ রূপ লাভ করে। David Harvey তার The Condition of Postmodernity (১৯৮৯) গ্রন্থে উত্তরাধূনিকতা বিকাশের সামাজিক পটভূমির যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন, তা এপর্যন্ত আমার কাছে সবথেকে গ্রহনযোগ্য মনে হয়েছে। তার আলোচনার মূল বিষয়বস্তুটা আগ্রহীদের সাথে শেয়ার করছি।-


হার্ভে আলোচনা শুরু করছেন জন ক্যালহানের (John Calhoun) একটা উক্তি দিয়া যার মর্মার্থ দাড়ায় এই রকমঃ


"পুরাতনের ক্ষয় আর নতুনের আগমনের মধ্যকার সময়টুকু হল একটা পরিবর্তনের কাল যা' অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, ভূল, বন্যতা আর হিংস্র উম্মত্ততায় ভরপুর।"


- হার্ভে এই পুরোনো হতে নতুনের আবির্ভাবের প্রেক্ষিতে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, স্থাপত্য, বা নন্দনতত্ত্বের জায়গায় আলোচনা করছেন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার, যা'র পরিবর্তনের মধ্যেই সূচিত হয় উত্তরাধূনিকতার। হার্ভে পুঁজিবাদী সমাজের এই পরিবর্তন আমেরিকায় Fordism বা ব্যাপকভিত্তিক শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা (mass production) আবির্ভাবের মধ্যে ব্যাখ্যা করছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা' পূর্ণতা পায়।


ফোর্ডিজমের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাস-প্রোডাকশন (যাকে আমরা জানি economy of scale হিসেবে)। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না, তা' বাজারজাতও করতে হবে। অর্থ্যাত, মানুষ যেন সেসব পণ্য কেনে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণীকেও নিয়ন্ত্রনে রাখতে হবে। - এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য পুঁজিবাদী শিল্পসমাজের প্রধান তিন ভিত্তি- রাষ্ট্র, কর্পোরেট পুঁজি, ও সংঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণী- নতুন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।


১৯৩০ এর দশকে আমেরিকায় মহামন্দার সময় জাতীয় অর্থনীতিকে উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্র সরাসরি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নেওয়া শুরু করে। রাষ্ট্রের এই অংশগ্রহনের মূলে ছিলো দেশীয় শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং এই লক্ষ্যে কর্পোরেট পুঁজি+সংঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণীকে একটা নির্দিষ্ট পথা চালিত করা। রাষ্ট্র-কর্তৃক বিভিন্ন শিল্পস্থাপনা কিনে নেওয়া, ব্যাপকহারে লোন দেওয়া, সরকারী খাতে (বিশেষ করে সামরিক খাতে) বড় বড় ক্রয়, রাস্তাঘাট, রেলপথ বিস্তার+সংস্কার ইত্যাদি শিল্প উৎপাদনে গতিশীলতা নিয়ে আসার মাধ্যমে রাষ্ট্র কর্পোরাট পুঁজিকে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাড় করায়। এরই ধারাবাহিকতায় মহামন্দার পরবর্তী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে আমেরিকায় শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক উৎপাদনের জন্য অনুকূল সামাজিক পরিস্থিতি তৈরী হয়। এসময়ই হেনরি ফোর্ডের শিল্প-ব্যবস্থাপনার ধারণা (যা বই আকারে প্রকাশিত হয়ছিল ১৯১৬ সালে) জনপ্রিয়তা পায়।


ফোর্ডের শিল্প-ব্যবস্থাপনার মূলে ছিল বিস্তৃত শ্রমবিভাজন যা'র মাধ্যমে অল্প খরচে অধিক পণ্য উৎপাদন করা যায়।আর উৎপাদন খরচ কম হওয়াতে সেই পণ্য বেশিরভাগ ক্রেতার নাগালের মধ্যেই থাকে, ফলে বিক্রিও বাইড়া যায় অনেক। এভাবে economy of scale আর্জিত হয়, যা'র মানেই হচ্ছে 'ক্রমবর্ধমান উৎপাদন>ক্রমবর্ধমান বিক্রি>ক্রমবর্ধমান মুনাফা'। - এই উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে দুটো সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হয়; এক, শ্রমিক অসন্তোষ, আর দুই, শ্রমিকের প্রতি রাষ্ট্রের ভূমিকা পরিবর্তন।


বিস্তৃত শ্রমবিভাজনকে আমেরিকার সংঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণী শুরু থেকেই কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা শুরু করে। কারণ, এরফলে শ্রমিকরা তাদের বিশেষ ব্যক্তিগত দক্ষতা হারায়া ফেলার আশংকা করে যেটা তাদেরকে চাকুরির নিশ্চয়তা দিত। ফোর্ড তাদেরকে মোকাবেলা করলেন অভিনব উপায়ে - ব্যাপক হারে অভিবাসী আর গ্রাম থেকে শহরে আসা শ্রমিকদেরকে নিয়োগ দিয়ে। কারণ, এই শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ না থাকায় এদেরকে নিয়ন্ত্রন করা সহজ ছিল।


এই নতুন ব্যবস্থায় পুঁজিপতি এবং শ্রমিকশ্রেণীর দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্থাপিত হইলো এক সোস্যাল কন্ট্রাক্ট, যা আইনের মাধ্যমে শ্রমিক আন্দোলনকে নিষিদ্ধ করল (Taft-Hartley Act, ১৯৫৩) এবং সেই সাথে পুঁজিপতিদের বাধ্য করল শ্রমিকদের ন্যুন্যতম মজুরী, সোস্যাল সিকিউরিটি, পেনশন, ইত্যাদি প্রদান করতে। ফলে নতুন নিযুক্ত এইসব অভিবাসী+সদ্য শহরে আসা শ্রমিকরা বর্ধিত সামাজিক মর্যাদা লাভ করলো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে সংঘাতের বদলে সহযোগিতা করা শুরু করলো। পুঁজিপতি+শ্রমিকের এই আপাতঃ সম্মিলিত প্রয়াসকে যুগপতভাবে সহযোগিতা করতে রাষ্ট্রও একাধারে শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য ওয়েলফেয়ার ব্যয় বাড়িয়ে চলল যা একদিকে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা+সহযোগিতা বৃদ্ধি করল, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন+রাষ্ট্রীয় ক্রয়ের মাধ্যমে পুঁজিপতিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন>ক্রমবর্ধমান মুনাফা অর্জনের সুযোগ দিলো। আবার 'শিল্প কর' থেকে প্রাপ্ত আয় রাষ্ট্রকে এইসব কর্মকান্ড চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান করল। এভাবে রাষ্ট্র+পুঁজি+শ্রমিকের যৌথ উদ্যোগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত পুজিবাদী দেশগুলোতে উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়।


ফোর্ডিজমের ফলে রাষ্ট্র, পুঁজিপতি ও শ্রমিক- সকলেরই আয়+ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। যেমন, স্বল্পমূল্যের ফোর্ড-গাড়ি শ্রমিকরা তাদের বর্ধিত মজুরির মাধ্যমে কিনে রাষ্ট্রের ব্যয়ে নির্মিত রাস্তায় চালাতে সক্ষম হয় যা তাদেরকে উন্নত জীবনযাত্রার স্বাদ দেয়। রাষ্ট্রও বর্ধিত হারে সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইত্যাদি) বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলে যা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি করে। আর এইসব থেকে শিল্প-মালিকও উপকৃত হয় অধিক উৎপাদনক্ষম শ্রমিক+ক্রয়ক্ষম ক্রেতা লাভ করে। - এভাবে ফোর্ডিজম শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, বরং সমাজের সর্বাত্মক পরিবর্তন ঘটায় যেখানে কল্যাণ-রাষ্ট্র (Keynesian, Welfare State), কর্পোরেট পুঁজি (monopolized, vertically arranged management) আর আপাতঃ সুবোধ (docile) শ্রমিকের পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে এক নতুন সমাজব্যবস্থার জন্ম হয় যেখানে ব্যয়+ভোগের মাধ্যমেই নির্ণীত হয় ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান (Consumer Society)।


ফোর্ডিজম জাতীয় পরিসর থেকে আন্তর্জাতিক বলয়ে প্রবেশ করে আমেরিকার রাজনৈতিক+অর্থনৈতিক প্রাধান্যের আশ্রয়ে। মার্শাল প্ল্যান+ব্রেটন উড প্রতিষ্ঠানগুলোর (IMF, World Bank)মাধ্যমে এবং মার্কিন ডলারকে আন্তর্জাতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপ আর জাপানের শ্রমবাজার+শিল্প উতপাদনে ফোর্ডিজম প্রবেশ করে। এখানে একটা বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য যে, সকল শিল্প উৎপাদনই কিন্তু ফোর্ডিজমে অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি, পেরেছে শুধু মাত্র যেগুলোতে ব্যাপক উৎপাদন+ব্যাপক মুনাফার পাশাপাশি 'রাষ্ট্রের সহায়তা+শ্রমিক নিয়ন্ত্রন' সম্ভব ছিল। যেমন, অটো-ইন্ডাষ্ট্রী। 'অধিক ঝুঁকিপূর্ণ' শিল্পে (যেমন-গার্মেণ্টস) তখনও কম স্বল্প মজুরি+স্বল্পস্থায়ী (নারী-শিশু-মাইগ্রেন্ট) শ্রমিকদেরই নিয়োগ করা হতো। একইভাবে, সকল দেশই ফোর্ডিষ্ট শিল্প-বলয়ের অন্তর্ভূক্ত হয়নি। শুধুমাত্র সেইসব দেশেই এটি বিস্তৃত হয়েছে যেখানে প্রচুর পরিমাণে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা+সুবোধ শ্রমিক রয়েছে, সেগুলো এর অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। এই 'নির্বাচিত' শিল্প+শ্রমিক অন্তর্ভূক্তির কারণে জাতীয়+আন্তর্জাতিক পরিসরে সাধারণভাবে শ্রমিকদের মধ্যে আয়ের (ফলশ্রুতিতে জীবনযাত্রায়ও) অসমতা দেখা দেয় যা ফোর্ডিজমের বৃদ্ধির সাথে সাথে ক্রমাগত বেড়েই চলে। ফোর্ডিষ্ট শিল্পের এইসব ভাগ্যবান শ্রমিকদেরকে গোল্ডথর্প বলেছেন The affluent workers আমেরিকায় যারা ছিলো মূলতঃ "সাদা-পুরুষ-সংঘবদ্ধ" শ্রমিক।


'ফোর্ডিষ্ট শিল্পের শ্রমিক' আর 'বাদবাকি শ্রমিক'দের মাঝে মজুরি আয়+জীবনযাত্রা ভিত্তিক এই যে পার্থক্য টানা হলো, তা' প্রাথমিক পর্যায়ে শিল্পের জন্য সহায়ক হলেও পরবর্তিতে একটা বড় 'ঝুঁকি' হিসেবে দেখা দেয়। শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের প্রাপ্ত সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে শিল্প-প্রতিষ্ঠানে যেকোন প্রকার পরিবর্তনের (নিয়ন্ত্রন, নতুন উতপাদন পদ্ধতি চালু করা, ইত্যাদি) বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শুরু করে যা' শ্রমিকের উপর <strong>পুঁজিপতির নিয়ন্ত্রনকে</strong> দূর্বল করে দেয়। শ্রমিক ইউনিয়নও নিজেদের প্রাপ্ত সুবিধাগুলোকে সংরক্ষণ করতে গিয়ে উক্ত শিল্পের বাইরে থাকা সকল শ্রমিকদের চোখে 'সুবিধাবাদী' হিসেবে চিহ্নিত হয় যা শ্রমিক আন্দোলনে তাদের <strong>(শ্রমিক ইউনিয়নের)</strong> ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অন্যদিকে <strong>কল্যাণ-রাষ্ট্র</strong> নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে চাহিদা (তথা জীবনযাত্রার মান) বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে প্রাপ্তির আশাও বাড়িয়ে দেয় যা'র জন্য ক্রমবর্ধমান হারে যে পরিমাণ 'শিল্পকর' উপার্জন প্রয়োজন, তা' স্বভাবতঃই পাওয়া যায় না।


ফলশ্রুতিতে জনগণের মাঝে ক্রমান্বয়ে হতাশা>অসন্তোষ দেখা দেয়। অন্যদিকে এসময় পণ্যের ষ্ট্যান্ডার্ডাইজড মাস-প্রোডাকশনের সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শাসন, দালানকোঠা, শিল্পকলা, সৌন্দর্যবোধ, ইত্যাদির ষ্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের বিরুদ্ধে একটা প্রবল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে খোদ আমেরিকাতেই। এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন বিকাশ লাভ করে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রমিকশ্রেণীর বাইরে অবস্থিত অন্যান্য শ্রম+পেশাজীবি এবং ক্ষেত্রবিশেষে বঞ্চিত সামাজিক গোষ্ঠীসমূহের (এরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলে পরিচিত) মধ্যে। শিল্পসমাজে এক্সক্লুডেড এইসব দলের সাথে যোগ দেয় বিশ্ব পরিমন্ডলে এক্সক্লুডেড দেশসমূহ (প্রধানত তৃতীয়বিশ্ব)।

- এই প্রকৃয়ায় ফোর্ডিজমের বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে চলে বঞ্চিত সাধারণ জনগণের অসন্তোষ যা' এক সময় গণবিক্ষোভের রূপ নেয়। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৩ এমনই এক উত্তাল সময় যখন শ্রমিক অসন্তোষের সাথে পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক মুদ্রাস্ফিতী+আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ফোর্ডিজম+কেইনসীয় রাষ্ট্রনীতির উপর দাড়িয়ে থাকা পুঁজিবাদী বিশ্বব্যব্যস্থা ভেঙ্গে পড়ে।


কর্পোরেট পুঁজি ১৯৭০ এবং ১৯৮০ দশক জুড়ে টিকে থাকার সংগ্রাম শুরু করে অর্থনৈতিক restructuring (প্রযুক্তি উন্নয়ন, যান্ত্রিকীকরণ, নতুন পণ্য+নতুন বাজার, সুবোধ শ্রমিকের নতুন বাজার, প্রতিষ্ঠানের একীভবন এবং উৎপাদনের সময়+পরিবহন ব্যয় কমানো, পণ্যের ডিজাইন ও স্থায়ীত্ব হ্রাস, ইত্যাদি); আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলে সামাজিক ও রাজনৈতিক readjustment (মুক্তবাজার, শ্রমিকদের উপরোক্ত সোস্যাল কন্ট্রাক্ট বাতিল, রাষ্ট্রের কল্যাণমূখী কর্মসূচী ও ব্যয় সংকোচন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার বিরাষ্ট্রীয়করণ, ইত্যাদি )।

- এই প্রকৃয়ায় যে নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার উদ্ভব হয় (Post-Fordism), হার্ভে তাকে ব্যাখ্যা করেছেন 'Flexible Accumilation' এর মধ্য দিয়ে যা' লক্ষ্যনীয় হয়ে ওঠে 'সার্ভিস সেক্টর'+'টাইম-স্পেস কম্প্রেশন' এ। সার্ভিস সেক্টরে প্রবেশের মাধ্যমে কর্পোরেট পুঁজি নিজে সরাসরি উৎপাদনে না থেকে শুধু পুঁজি বিনিয়োগে সড়ে আসে, আর উৎপাদনের কাজ দিয়ে দেয় সেমি-কন্ডাক্টর, কন্সাল্ট্যান্ট, ফ্যামিলী+ফ্রীল্যান্স প্রডিউসার, ইত্যাদিকে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে 'টাইম-স্পেস কম্প্রেশন' আসে যা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে উৎপাদন সমন্বয় সম্ভব করে। ফোর্ডিজম বা মাস-প্রোডাকশনের যুগে যেখানে পণ্যের মান (স্থায়ীত্ব) আর উৎপাদনের পরিমাণ ষ্ট্যান্ডার্ড (অধিক), পোষ্টফোর্ডিজমে পণ্য আকারে ছোট, স্বল্পায়ু, কিন্তু দামে অধিক (কাজেই মুনাফাও বেশি)।


এই যুগের উৎপাদনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে- বাজারে নিত্যনতুন পণ্যের আগমন, সেই সাথে নতুন নতুন সেবাখাতের উদ্ভব, এবং এদের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত প্রযুক্তিগত+ব্যবসায়িক+সাংগঠনিক পরিবর্তন। একইভাবে ফোর্ডিজম যেখানে বিশাল বিশাল শিল্পশহরের জন্ম দিয়েছে (শিকাগো, ডেট্রয়েট, টয়োটা সিটি, বুসান, ইত্যাদি), পোষ্টফোর্ডিজমে তার ঠিক উল্টোটা, অর্থ্যাত সেইসব শহরের তুলনায় আকারে ছোট কিন্তু আর্থিক মূল্যে অনেক বড় "গ্লোবালসিটি" যেমন- সিলিকন ভ্যালী, দুবাই, সাংহাই, ইত্যাদি। (এখানে উল্লেখ্য যে, ফোর্ডিজম যেমন সব দেশ+শিল্প'কে অন্তর্ভূক্ত করেনি, পোষ্টফোর্ডিজমও মাত্র অল্প কিছু খাত+শহর+দেশ'কে অন্তর্ভূক্ত করেছে)। পূর্বোক্ত ব্যবস্থা যেমন স্থায়ী চাকুরী+সেবা+কল্যাণের স্বীকৃত দেয়, নতুন ব্যবস্থা ঠিক এর বিপরীতে এইসব সুবিধা রদ করে। - ফলশ্রূতিতে পূর্বের ব্যবস্থার শান্ত+নিশ্চিত+তুলনামূলক স্থায়ী অবস্থার স্থানে দেখা দেয় অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা-অশান্তি।


- এটাই হচ্ছে পোষ্টমডার্নিজমের অস্থায়ীত্ব-অস্থিরতা-সংশয়-সংকটের বস্তুগত সামাজিক ভিত্তি।


[এই লেখাটা ২০০৯ সালে ক্যাডেট কলেজ ব্লগে প্রথম পাবলিশ করছিলাম :) ]

89 views0 comments

Recent Posts

See All

‘বাঙালি মুসলমানের মন’: গোঁজামিলের এক জ্ঞানবৃক্ষ

১ জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন মাত্রা আছে, আছে তার বিবিধ বহিঃপ্রকাশ। মোটাদাগে, জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে জড়িয়ে থাকা উপাদানগুলোকে আলাদা করা হয় জাতিসত্তা (ethnic membership) এবং নাগরিকতার পরিচয়ের (political membersh

Comments


bottom of page